আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মুখোমুখি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে 'অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ' এর দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
মার্কিন সময় সকাল ১০:০০ টা (জিএমটি ১৪:০০) থেকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে এই অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখন একটি চুক্তির জন্য 'খুবই মরিয়া' হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, আজ সকালেই "উপযুক্ত ব্যক্তিরা' তার কাছে একটি সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে ফোন করেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের সুর ছিল বরাবরের মতোই কঠোর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অবরোধ চলাকালীন যদি ইরানের কোনো 'ফাস্ট অ্যাটাক শিপ' বা দ্রুতগামী যুদ্ধজাহাজ মার্কিন বহরের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে, তবে সেগুলোকে 'অবিলম্বে নির্মূল করা হবে। এই সরাসরি হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি ইরানের সরকারকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে যানচলাচল বাধাগ্রস্ত করে ইরান মূলত 'অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ' চালাচ্ছে। ওয়াশিংটনের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই রুটে ইরানের হস্তক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার শামিল। মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এবার ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে বদ্ধপরিকর।
মার্কিন এই হুমকির মুখে ইরানও নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কোনো ধরনের হুমকির মুখে 'আত্মসমর্পণ করবে না। যদিও ট্রাম্পের সর্বশেষ 'নির্মূল' করার হুমকির বিষয়ে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে দেশটির সামরিক বাহিনী পারস্য উপসাগরে উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে 'UK Maritime Trade Operations (UKMTO) একটি জরুরি পরামর্শ জারি করেছে। তারা জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ব্যাপক 'সামরিক উপস্থিতি' এবং 'রাইট-অফ-ভিজিট' বা তল্লাশি প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাদানুবাদ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ট্রাম্প পোপের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, তিনি 'পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভয়াবহ'। এর জবাবে পোপ ফ্রান্সিস শান্তভাবে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে যুদ্ধ নিয়ে কোনো তর্কে জড়ানোর 'কোনো ইচ্ছা তার নেই'। পোপের এই সংযত অবস্থান ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক কূটনীতির বিপরীতে এক বিশেষ বার্তা বহন করছে।
ইরানের ওপর এই নৌ-অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ অবরুদ্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। ট্রাম্পের 'নির্মূল' করার নির্দেশ সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকেও একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
একদিকে ট্রাম্প বলছেন ইরান চুক্তি করতে চায়, অন্যদিকে ইরান বলছে তারা মাথা নত করবে না। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথকে সংকীর্ণ করে দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধ ও সামরিক হুমকি, অন্যদিকে ইরানের অনড় অবস্থান সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বারুদের স্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন নির্ধারণ করবে এই উত্তেজনা প্রশমিত হবে নাকি বিশ্ব আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের সাক্ষী হবে।
এএন