আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) শেষ হতে যাওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঠিক দুই দিন আগে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সাথে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘ব্লেম গেম‘বা দোষারোপের রাজনীতি করছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইরানকে চাপে ফেলার জন্য মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেবে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর হওয়া বিভিন্ন হামলা, যা তারা কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। ইরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের মতে, আমরা সেই দেশের সাথে আলোচনায় বসতে পারি না যারা একদিকে চুক্তির প্রস্তাব দেয়, আর অন্যদিকে আমাদের পিঠে ছুরি মারে। অতীত এবং বর্তমানের হামলাগুলো ভুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে মার্কিন আলোচকদের পাকিস্তানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের অনড় অবস্থান এই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, তারা যুদ্ধের অবসান চায় এবং একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে ইচ্ছুক। তবে তেহরানের দাবি, এটি কেবল একটি লোকদেখানো নাটক।
ইরান সরাসরি ওয়াশিংটনকে অভিযুক্ত করে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা আলোচনায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করছে। তেহরানের মতে, তারা কখনোই এই দ্বিতীয় দফার আলোচনায় যোগদানের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এই গুঞ্জন ছড়িয়েছে যাতে ইরান উপস্থিত না হলে তাকে বিশ্ব দরবারে ‘শান্তি বিরোধী‘ হিসেবে চিত্রায়িত করা যায়। এই কৌশলকে ইরান ‘মানসিক যুদ্ধ‘ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আগামী ২২ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো চুক্তি বা আলোচনা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই উত্তেজনার প্রভাব সবথেকে বেশি পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই সংকটে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহার করে একটি মধ্যপন্থা খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত অন্যায্য চাপ এবং আক্রমণাত্মক নীতি পরিহার করছে, ততক্ষণ কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাও ফলপ্রসূ হবে না।
ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় না আসার পেছনে মূলত তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসা এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ তেহরানের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হওয়া হামলাগুলোকে ইরান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। চাপের মুখে আলোচনায় বসা মানে পরাজয় স্বীকার করা এমন একটি রাজনৈতিক আদর্শ বর্তমানে ইরানের ক্ষমতায় থাকা নেতৃত্বের মধ্যে প্রবল।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্যদিকে ইরানের শক্ত অবস্থান। ২২ এপ্রিলের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে পুরো বিশ্ব উদ্বিগ্ন। যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তবে অঞ্চলটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বিধ্বংসী যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে।
তেহরানের বার্তা পরিষ্কার তারা আলোচনা চায়, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং হামলার সম্পূর্ণ বন্ধের ভিত্তিতে, কোনো চাপের মুখে নয়।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড নিউজ
এএন