আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুলাই ২৩, ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ের মাঝে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তেহরান বর্তমানে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য একেবারেই প্রস্তুত নয়। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই কঠোর বার্তার পরপরই ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন ইরানি ভূখণ্ডে টানা ১২তম রাতের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার বিমান হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুই দেশের তীব্র রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ সব মিলিয়ে সমগ্র অঞ্চলে এক ভয়াবহ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং জাতিসংঘের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা স্পষ্ট করে বলছেন, আকাশপথে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ নয়, বরং সরাসরি ও বাস্তবমুখী কূটনীতিই পারে এই মারাত্মক সংঘাতের ইতি টানতে।
১২তম রাতের তীব্র বিমান হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়ানো হয়েছে। টানা ১২ দিনের অভিযানের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ইরান ও ইরাকের মধ্যবর্তী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'শলামচে' (Shalamcheh) সীমান্ত ক্রসিংয়ে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় কমপক্ষে দুইজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, হামলাটি যখন ঘটে তখন সীমান্ত ক্রসিং এলাকায় পণ্যবাহী যানবাহন এবং সাধারণ মানুষের আনাগোনা ছিল। বিমান হামলায় সীমান্তের বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকি, প্রশাসনিক ভবন এবং পরিবহন সুবিধা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শলামচে সীমান্ত পয়েন্টটি ইরান ও ইরাকের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, কাঁচামাল পরিবহন এবং ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের জন্য অন্যতম প্রধান একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অবকাঠামোতে বোমাবর্ষণ কেবল সামরিক ক্ষতিতেই সীমিত থাকছে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির করে দিয়ে একটি মানবিক সংকট তৈরি করছে।
বিগত ১২ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার অভিযানে ইরানের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন করে প্রাণহানির খবর আসছে, যার ফলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর হুংকার
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও কঠোর মন্তব্য করেছেন। রুবিওর মতে, ইরানি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আলোচনার কথা বললেও বাস্তবে তারা কোনো টেকসই ও বাস্তবসম্মত চুক্তিতে আসার মানসিকতা দেখাচ্ছে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইরানি পক্ষ বর্তমানে চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি চুক্তির জন্য আকুতি জানাচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে যখনই কোনো বাস্তবমুখী সমঝোতার কথা আসে, তারা পিছু হটে যায়। তারা স্পষ্টতই কোনো চুক্তি করতে প্রস্তুত নয়। তাদের এখন বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা উচিত এবং দ্রুত নিজেদের হুঁশে আসা প্রয়োজন।
মার্কিন প্রশাসনের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর তাদের ‘সর্বোচ্চ সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ’ নীতি থেকে একচুলও সরে আসতে রাজি নয়। মার্কিন সরকারের মতে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত রাখা হবে।
রুবিওর এই বক্তব্য মূলত ইরানি নেতৃত্বের ওপর মানসিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে তেহরান এই ধরনের হুমকি ও চাপকে সবসময়ই তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে আসছে।
‘কূটনীতিই শেষ কথা’ মার্টিন গ্রিফিথসের গুরুত্বপূর্ণ তাগিদ
মার্কিন সরকারের এই আগ্রাসী সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। জাতিসংঘের সাবেক জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী এবং অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী মার্টিন গ্রিফিথস মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বক্তব্য দিয়েছেন।
গ্রিফিথস স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই বিধ্বংসী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করার জন্য কূটনীতির চেয়ে ভালো বা কার্যকর কোনো বিকল্প দ্বিতীয় পথ নেই। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান অর্জন করা অসম্ভব।
মার্টিন গ্রিফিথসের মতে, বিমান হামলা চালিয়ে কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে হয়তো প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে দুর্বল করা সম্ভব, কিন্তু তাতে স্থায়ী শান্তি আসে না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান ঘটে আলোচনার টেবিলেই। তাই যত দ্রুত ওয়াশিংটন ও তেহরান সামরিক পথ পরিহার করে গঠনমূলক আলোচনায় বসবে, তত দ্রুত একটি বৈশ্বিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও সতর্ক করেন যে, সংঘাত যদি এভাবে দীর্ঘায়িত হয়, তবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে খাদ্যসংকট, শরণার্থী সমস্যা, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় নতুন মাত্রা লাভ করবে, যা সামাল দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক ও বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই সরাসরি যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বজুড়ে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা
ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। তাছাড়া পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর ফলে এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইরাক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ
শলামচে সীমান্তে বিমান হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের ওপর। ইরাকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ইরানের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও বিদ্যমান। এই দুই মহাশক্তির লড়াই ইরাকের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর অবস্থান
রাশিয়া ও চীন শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের এই একতরফা বিমান হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। বেইজিং ও মস্কো অবিলম্বে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো জ্বালানি সংকট ও শরণার্থী প্রবাহ বৃদ্ধির ভয়ে গভীরভাবে চিন্তিত।
সংঘাতের মূল কারণ ও দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা
পারমাণবিক কর্মসূচি: ওয়াশিংটনের প্রধান অভিযোগ হলো ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক শক্তি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য নির্ধারিত।
আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি যুদ্ধ: ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাকে ইরানের সমর্থিত আঞ্চলিক মিত্রদের উপস্থিতি ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান বহু বছর ধরে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন। এর জবাবে ইরানও তাদের সামরিক প্রতিরোধ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে উভয় পক্ষই একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থায় আটকা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে ইরানকে নিঃশর্ত শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে, অন্যদিকে ইরান তাদের জাতীয় আত্মসম্মান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ধরনের মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে নারাজ।
কোন পথে ভবিষ্যৎ?
চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেবল বোমাবর্ষণ করে এই সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান আনা সম্ভব নয়। এতে কেবল বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার বীজ আরও গভীরে প্রোথিত হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তেহরানের সদিচ্ছা নিয়ে যতই প্রশ্ন তুলুন না কেন, কিংবা ওয়াশিংটন যতই সামরিক শক্তি প্রদর্শন করুক না কেন- মার্টিন গ্রিফিথসের কথার সত্যতাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। রক্তপাত বন্ধ করতে হলে এবং একটি আঞ্চলিক বিপর্যয় এড়াতে হলে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষকেই নমনীয়তা প্রদর্শন করতে হবে। অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং টেবিল আলোচনায় ফেরাই এখন বিশ্বশান্তির জন্য একমাত্র পথ।
এএন