রুহেল হাশেমী
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৩:৪১ পিএম
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তৃতীয় দিনের মতো মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরকে সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। যেখানে তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে। সেখানে তিনি অভিযোগগুলোর প্রেক্ষাপট ও প্রমাণ তুলে ধরেন।
ট্রাইব্যুনালে এই সাক্ষ্যগ্রহণ দিকনির্ধারণী হতে পারে, কারণ এটি মামলার ৫৪তম ও শেষ বাস্তব সাক্ষ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে।
জুলাই–আগস্ট আন্দোলন
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত একটি বৃহৎ গণজাগরণে রূপ নেয়। কিন্তু সে সময় তৎকালীন সরকার গুলিবর্ষণ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা চালিয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই দুই মাসে ৪১টি জেলায় ৪৩৮টি স্পটে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং ৫০টিরও বা অধিক জেলায় মারণাস্ত্র (বর্ষনাস্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র) ব্যবহৃত হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ একটি তথ্য বলেছে, পুলিশ ৩ লক্ষ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল।
আদালতে প্রদর্শিত প্রমাণগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৭টি ভিডিও ক্লিপ যা আন্দোলন দমনের সময় গৃহীত বিভিন্ন ঘটনা চিত্রায়িত করে। মো. আলমগীর তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, এই ভিডিওগুলো প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল-১ তার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করে এসেছে, যাতে জনসাধারণ ও মিডিয়াও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
প্রসিকিউশন পক্ষ ৫টি মানবতাবিরোধী অভিযোগ দায়ের করেছে, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গণহত্যা (মাস কিলিংস), হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন।
সংশ্লিষ্ট দালিলিক প্রমাণ ও জব্দ তালিকা
আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার, যা তথ্যসূত্র ও জব্দকৃত প্রমাণসহ বিস্তারিতভাবে সাজানো। মোট সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারিত ছিল ৮১ জন।
একপর্যায়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী (স্টেট উইটনেস) হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, মো. আলমগীর তার জবানবন্দিতে এমন তথ্য উপস্থাপন করেছেন যা শেখ হাসিনাকে সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবেই অভিযুক্ত করে।
মুখ্য তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে মো. আলমগীর প্রধান প্রমাণদাতা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছেন। তিনি গত দুই দিন যাবৎ (২৯-৩০ সেপ্টেম্বর) জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দির সময় তিনি পরিচয় দিয়েছেন এবং ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে ১৭টি ভিডিও ক্লিপ উপস্থাপন করেছেন যা গত জুলাই–আগস্ট গণহত্যার দৃশ্যমান প্রমাণ।
প্রসিকিউটর তানভীর জোহা আগেই বলেছিলেন, এই মামলায় বেশ কিছু ফোন রেকর্ড জব্দ করা হয়েছে। যেমন, শেখ হাসিনা-সাবেক আইজিপি ও সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রীর। আদালতে সেগুলিও বাজিয়ে শোনানো হবে।
মামলায় এটি ৫৪তম ও শেষ সাক্ষী তাই তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরাই শেষ পর্যায়ে মামলার সমরূপ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
আদালতের ভূমিকা ও নিরাপত্তার অবস্থা
ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এভাবে কার্যকর করছেন যে, সরাসরি সম্প্রচারের মধ্যদিয়ে জনসাধারণ মামলার প্রক্রিয়া দেখছে।
দায়িত্বশীলভাবে তারা আশ্বস্ত করছেন আইন বিরোধী কোন ব্যাঘাত বা প্রভাব সৃষ্টি হবে না। তবে, উচ্চ মাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আদালতের তরফে তারা জবানবন্দি গ্রহণ ও জেরার সময় সুনির্দিষ্ট সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি
প্রসিকিউশন পক্ষ (চিফ প্রসিকিউটর ও তাদের দল) আশাবাদী যে, আলমগীরের জবানবন্দি মামলার মূল ভিত্তি হয়ে উঠবে। এই জবানবন্দির মধ্যদিয়ে তারা দাবি করবে যে, শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন গুলিবর্ষণ ও হত্যা সুপ্রেস করার। সংশ্লিষ্ট ভিডিও ও কল রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিচার প্রক্রিয়ায় এই সাক্ষ্য সঠিকভাবে যাচাই ও গ্রহণ হলে দোষ প্রমাণ সম্ভব হবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে দিল্লিতে অবস্থান নেন। ঠিক সেই সময় ঢাকায় তার কলরেকর্ড মুছে ফেলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন সন্ধ্যায় এনটিএমসির সার্ভার থেকে শেখ হাসিনার চারটি মোবাইল নম্বরের মালিকানাসহ অন্তত এক হাজার কলরেকর্ড মুছে ফেলা হয়।
ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে এনটিএমসির কিছু চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা এসব ডিজিটাল তথ্য নষ্ট করেন। এ ঘটনায় কলডেটা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও জানান, একই সময়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সাবেক এক পরিকল্পনা মন্ত্রীর কলরেকর্ডও মুছে ফেলা হয়।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার ফোনালাপে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোসহ নানা নির্দেশনার প্রমাণ পাওয়া যায়। আন্দোলন দমন ও হতাহতের তথ্য গোপন করতে তখন হঠাৎ হঠাৎ ইন্টারনেট বন্ধ করা হতো। কিন্তু এ কারণে শেখ হাসিনাকে অনেকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে হয়, যা পরে তার জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
প্রসিকিউশন আশা করে, আদালত এই জবানবন্দি ও প্রমাণ যুক্তিপূর্ণভাবে বিবেচনা করবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে যাবে।
আসামিপক্ষের (ডিফেন্স) প্রতিক্রিয়া: আসামিপক্ষ মুখ্যভাবে যুক্তি তুলে ধরেছে যে, প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি তারা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ভিডিও ও কল রেকর্ড সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও হস্তান্তর করা হয়নি, রেকর্ড মুছে ফেলার অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে প্রমাণ ধ্বংসের অভিযোগ উঠতে পারে। জবানবন্দি গ্রহণ ও জেরা প্রক্রিয়ায় আইনগত অনিয়ম বা প্রভাব বিশ্লেষণ হবে।
রাষ্ট্রপক্ষে পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব: ডিফেন্স দাবি করতে পারে যে ট্রাইব্যুনাল ও প্রসিকিউশন পক্ষ রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। বিচারকার্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে “রূপান্তর” বা “দুঃশাসন পুনরাবৃত্তি না হতে” ইত্যাদি যুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। অতীতে ট্রাইব্যুনালের অধিদিক্ষায় কিছু সমালোচনা ছিল যে এটি রাজনৈতিক মামলা পরিচালনায় ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রমাণের দুর্বলতা: প্রমাণ হাসিলের ঠিক নিয়মানুসারে করা হয়েছে কি না, তা প্রশ্ন তুলে ধরা হবে। অনেক ঘটনাই দুর্যোগপূর্ণ ও কথিত গরম মাথার মুহূর্তে, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি পরস্পরবিরোধী হতে পারে। কল রেকর্ড ও ভিডিওর প্রামাণ্যতা (ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন, সম্পাদনা) চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
উপস্থিতি ও দৃষ্টান্তের অভাব: আসামি শেখ হাসিনা ও কামাল বিদেশে রয়েছেন। সরাসরি যুক্তি উপস্থাপন বা তাদের জবাব দেওয়ার জায়গা সীমাবদ্ধ। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (পাবলিক ডিফেন্ডার) নিযুক্ত হয়েছে, যারা দৃষ্টান্ত তৈরি করবেন। ডিফেন্সের যুক্তি এবং অভিযোজনগুলি আদালত ও জনমতের দৃষ্টিতে গুরুত্ব পাচ্ছে, বিশেষ করে যখন প্রমাণ ও প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধতা।
কী হতে পারে ফলাফল?
জবানবন্দি ও প্রমাণের মূল্যায়ন
মো. আলমগীরের জবানবন্দি যদি আদালত ও বিচারপতি বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করেন তাহলে এটি মামলায় গঠনমূলক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রমাণ ও যুক্তি মিলিয়ে দোষ প্রমাণে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
প্রক্রিয়াগত প্রশ্নবিদ্ধতা
কোনো প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, প্রমাণ ধ্বংসের অভিযোগ বা প্রমাণ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরে অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক আপিল বা ব্যতিক্রমমূলক দাবি করতে পারে।
রাজনৈতিক ও জনমত চাপ
যেহেতু মামলাটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, জনমত ও মিডিয়া প্রতিক্রিয়া বিচার প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ও ঊর্ধ্বতনের নজর
বিচারপতির প্যানেল ও উচ্চ আদালতের নজর এ ধরনের মামলায় থাকে সিদ্ধান্তে আইনি শক্তি ও ন্যায্যতা বজায় রাখার চাপে তারা সচেতনভাবে চলবেন।
সম্ভাব্য রায় ও পরবর্তী ধাপ
যদি দোষ প্রমাণ হয় আসামিরা মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে যাবতীয় আইনগত শাস্তি ভোগ করবেন। যদি অসমর্থ ও প্রমাণহীন বলে রায় আসে, ডিফেন্স পক্ষ সাফাই পেতে পারে। পরবর্তী আপিল বা উচ্চ আদালতের পর্যায়ে বিষয় গৃহীত হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন, বিচারপরবর্তী উত্তেজনা অদূরকারণ নাও হতে পারে।
মোহাম্মদ আলমগীরের তৃতীয় দিনের জবানবন্দি আজ ট্রাইব্যুনালকে উচ্চমাত্রায় প্রত্যাশার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি সাক্ষ্যগ্রহণ নয়, এটি মামলার চূড়ান্ত মোড় হতে পারে। বিচারপতির সিদ্ধান্ত, প্রমাণ গ্রহণ ও বিশ্লেষণ, এবং ডিফেন্স-প্রসিকিউশনের যুক্তি–বিচার প্রক্রিয়ায় মিলিয়ে দেখবে যে, এই মামলা কি সত্যিই “ন্যায়বিচার” দিয়ে শেষ হবে নাকি রাজনৈতিক চাপে ও বিতর্কে শেষ হয়ে যাবে।
আরএইচ/ইএইচ