তনয় অধিকারী
এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
পহেলা বৈশাখের সকালটা ছিল অন্যরকম। ভোরের হালকা আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকতেই তন্ময় চোখ খুলে ফেলল। বাইরে পাখির ডাক, দূরে কোথাও ঢাকের শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা যেন একটু বেশি জীবন্ত।
সে দ্রুত উঠে পড়ল। নতুন পাঞ্জাবিটা আগেই বিছানার পাশে রেখে দিয়েছিল। পরতে পরতেই মনে পড়ল—আজ শুধু নতুন বছর নয়, নতুন করে শুরু করার দিন।
বাড়ির বাইরে বের হতেই চারপাশে উৎসবের রঙ। লাল-সাদা শাড়ি পরা মেয়েরা, পাঞ্জাবি-পাজামা পরা ছেলেরা, সবার মুখে হাসি। রাস্তায় ছোট ছোট দোকান—পান্তা-ইলিশ, মিষ্টি, আর নানা রকম হাতের তৈরি জিনিস। বাতাসে মিশে আছে নতুনত্বের গন্ধ।
তন্ময় হাঁটতে হাঁটতে মেলার দিকে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল, একটা ছোট ছেলে এক কোণে বসে বাঁশি বিক্রি করছে। ছেলেটার চোখে কেমন এক আশা, আবার একটু লাজুক হাসিও আছে।
তন্ময় একটা বাঁশি হাতে নিয়ে বলল,
— “কত দাম?”
ছেলেটা একটু দ্বিধা করে বলল,
— “ভাইয়া, আপনার ইচ্ছা…”
তন্ময় মুচকি হেসে একটু বেশি দাম দিল। ছেলেটার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই মুহূর্তে তন্ময়ের মনে হলো—পহেলা বৈশাখ শুধু আনন্দ করার দিন নয়, কারও মুখে হাসি ফোটানোরও দিন।
মেলার ভিড়ের মাঝেই সে বাঁশিটা বাজানোর চেষ্টা করল। সুরটা ঠিকমতো উঠল না, কিন্তু তার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি কাজ করছিল। যেন জীবনের সব চাপ, দুঃখ, হতাশা—সবকিছু একটু দূরে সরে গেছে।
হঠাৎ করে আকাশে লাল-হলুদ ঘুড়ি উড়তে শুরু করল। তন্ময় আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“নতুন বছর, নতুন আমি… এবার একটু বদলাবো।”
দিন শেষে বাড়ি ফেরার সময়, তার হাতে শুধু একটা বাঁশি ছিল না—ছিল একটা নতুন আশা, ছিল তৃপ্তির ছোঁয়া।
পহেলা বৈশাখ তাকে শিখিয়ে দিল—
জীবন যতই কঠিন হোক, নতুন করে শুরু করার সুযোগ সবসময় থাকে।
এই দিন হীনম্মন্যতা দূর করার দিন। এই দিন ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করার দিন।
খারাপ দিনগুলোকে বালুতে লেখার দিন, ভালো দিনগুলো পাথরে লেখার দিন।
বাতাসে বালু এলোমেলো হয়ে যাবে, কিন্তু পাথরের কিছুই হবে না। এই দিন নিশ্বাস নেওয়ার দিন। এই দিন খুঁজে পাওয়ার দিন।
দিন শেষে তন্ময় আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। নতুন বছরের আলো যেন তার মনেও ছড়িয়ে পড়েছে। সে ধীরে ধীরে বলল—
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা!