আমার সংবাদ ডেস্ক
এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালে জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী একটি গ্রাফিতিকে ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গ্রাফিতিতে লেখা ছিল- “ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস।” পরে সেখানে স্প্রে করে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে তার জায়গায় ‘গুপ্ত’ লেখা হয়, ফলে বাক্যটি দাঁড়ায়- “গুপ্ত রাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস।”
এই একটি শব্দ ঘিরেই শুরু হয় সংঘর্ষ। ইটপাটকেল নিক্ষেপ, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং ক্লাস বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় ক্যাম্পাসে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ছাত্রশিবিরের এক নেতার পায়ের গোড়ালি গুরুতর আহত হয়েছে বলে জানা যায়।
‘গুপ্ত’ শব্দের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
‘গুপ্ত’ শব্দটি সংস্কৃত ‘গুপ্’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ রক্ষা করা বা গোপন রাখা। ইতিহাসে এই শব্দটি একদিকে নিরাপত্তা, অন্যদিকে গোপন কর্মকাণ্ডের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তক কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রে’ রাষ্ট্র পরিচালনায় গোপন তথ্য সংগ্রহ বা গুপ্তচর ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি ছিল এই ‘গুপ্ত ব্যবস্থা’, যেখানে রাজা সব জানতেন, কিন্তু কেউ জানত না রাজা কী জানেন।
উপমহাদেশে গুপ্ত রাজনীতির ইতিহাস
বাংলার উপনিবেশিক সময়ে ‘গুপ্ত’ শব্দটি বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। ১৯০২ সালে ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং পরবর্তীতে ‘ঢাকা অনুশীলন সমিতি’, ‘যুগান্তর’সহ বিভিন্ন সংগঠন গোপনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যায়।
বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টারদা সূর্য সেনসহ বহু বিপ্লবীর আন্দোলনও ছিল গোপন সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত। ব্রিটিশরা এগুলোকে ‘সিক্রেট রেভল্যুশনারি অ্যাসোসিয়েশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে বামপন্থি আন্দোলন ও নকশালপন্থী সংগঠনগুলোও আন্ডারগ্রাউন্ড বা গুপ্ত রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ‘গুপ্ত’ শব্দটি আবারও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ একে কেন্দ্র করে একে অপরকে আড়াল থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ তোলে।
বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে এই শব্দটি এখন প্রতীকী রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ধারাবাহিক উত্তেজনারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে একটি শব্দই রাজনৈতিক পরিচয় ও দ্বন্দ্বের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এএন