নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫, ০৬:০১ পিএম
ঢাকার আকাশে তখন সন্ধ্যার নরম আলো। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ধীরে ধীরে থামে, তখন সেটি আর শুধু একটি বিমান ছিল না ছিল একটি ইতিহাসের নীরব প্রত্যাবর্তন। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মরদেহ। একজন কণ্ঠস্বর, একজন প্রতিবাদী মুখ, একজন অকুতোভয় মানুষের শেষ যাত্রা সম্পন্ন হলো আকাশপথে।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটটি অবতরণ করে। এর কিছু ঘণ্টা আগেই, বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩ মিনিটে, সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল সেই ফ্লাইট যার প্রতিটি মিনিট যেন ভারী হয়ে উঠেছিল অপেক্ষমাণ মানুষের বুকের ভেতর।
ওসমান হাদির মরদেহ দেশে ফেরার খবরে রাজধানীর বাতাসেও যেন চাপা শোকের অনুভূতি। বিমানবন্দর এলাকায় আগে থেকেই অবস্থান নেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সংগঠনের নেতাকর্মী, ছাত্র-জনতা ও শুভানুধ্যায়ী অনেকে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখের কোণে অশ্রু লুকিয়ে, কেউ আবার নিঃশব্দে প্রার্থনায় ডুবে ছিলেন। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, আবার অনেকের হাতে শুধু শূন্যতা।
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ সরাসরি নেয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হবে। সংগঠনটির ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে আহ্বান জানানো হয় শহীদ ওসমান হাদিকে বরণ করতে সবাই যেন সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন, যেন শোক পরিণত না হয় বিশৃঙ্খলায়, আর শ্রদ্ধা হারিয়ে না যায় উত্তেজনায়।
ওসমান হাদি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু বক্তব্যে নয়, জীবন দিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর সত্যের পক্ষে। তার মৃত্যু তাই কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি একধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত, যা দেশের নানা স্তরে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ ডিসেম্বর। রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগের উদ্দেশ্যে বের হলে হঠাৎ করেই চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি ছোড়া হয় ওসমান হাদির দিকে। একটি গুলি এসে লাগে তার মাথায়। মুহূর্তেই তিনি লুটিয়ে পড়েন রক্তাক্ত অবস্থায়। দ্রুত তাকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচার হলেও তার অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক।
পরবর্তীতে তাকে স্থানান্তর করা হয় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নেয়া হয় সিঙ্গাপুরে। দেশজুড়ে তখন শুরু হয় প্রার্থনা, উদ্বেগ আর অপেক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই মানুষ খোঁজ নিতেন—কেমন আছেন হাদি? ফিরবেন তো?
কিন্তু সব অপেক্ষার অবসান ঘটে বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ওসমান হাদি। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে রাজপথ থেকে ভার্চুয়াল জগত পর্যন্ত। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠন শোক প্রকাশ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক পক্ষ থেকে আসে বিবৃতি।
আজ তার মরদেহ দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে শুরু হলো আরেক অধ্যায়—শ্রদ্ধা, স্মরণ আর বিচারের দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ পরিণত হতে যাচ্ছে শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে। সেখানে শুধু জানাজাই নয়, উচ্চারিত হবে নীরব প্রতিজ্ঞা হাদির মৃত্যু বৃথা যেতে দেয়া হবে না।
ওসমান হাদির জীবনের শেষ যাত্রা তাই শুধু একটি ফ্লাইটের অবতরণ নয়; এটি একটি সময়ের সাক্ষ্য। এমন এক সময়, যখন প্রশ্নগুলো আরও ধারালো, উত্তরগুলো আরও জরুরি। তিনি আর কথা বলবেন না, মঞ্চে দাঁড়াবেন না, স্লোগান তুলবেন না কিন্তু তার অনুপস্থিতিই হয়তো আরও জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলবে।
ঢাকার আকাশে সেই সন্ধ্যায় যে বিমানটি থেমেছিল, তা শুধু একজন মানুষের দেহ নিয়ে আসেনি নিয়ে এসেছে শোক, দায়বদ্ধতা আর ইতিহাসের ভার।
ইএইচ