ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

পরিসংখ্যানের ‘শৃঙ্খল’ মুক্তি: বিবিএসের তথ্যে কি ফিরবে জনআস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

পরিসংখ্যানের ‘শৃঙ্খল’ মুক্তি: বিবিএসের তথ্যে কি ফিরবে জনআস্থা

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির নাড়ি-নক্ষত্র পরিমাপের প্রধান হাতিয়ার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে ছিল নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে বিগত সরকারগুলোর আমলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো এবং মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাকে ‘পরিসংখ্যানের কারসাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

এই অচলায়তন ভাঙতে এবং বিবিএসকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। সম্প্রতি জারি করা ‘পরিসংখ্যান প্রণয়ন, প্রকাশ ও সংরক্ষণ’ নীতিমালার আওতায় এখন থেকে যেকোনো পরিসংখ্যান প্রকাশের জন্য আর পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না। বিবিএসের মহাপরিচালক (ডিজি) নিজেই এখন থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য প্রকাশের ক্ষমতা পাচ্ছেন।

২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইন অনুযায়ী বিবিএস জনশুমারি, কৃষিশুমারি, জিডিপি এবং মূল্যস্ফীতির মতো স্পর্শকাতর তথ্যগুলো তৈরি করে। কিন্তু রীতি অনুযায়ী, এসব তথ্য প্রকাশের আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর সবুজ সংকেত নিতে হতো। অভিযোগ রয়েছে, তথ্যগুলো যদি সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রতিকূলে যেত, তবে তা আটকে দেওয়া হতো বা কাটছাঁট করা হতো।

২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিবিএসের তথ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চরম রূপ দেখা গিয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এমনকি তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সময়ে মূল্যস্ফীতির তথ্য তিন মাস পরপর প্রকাশের অদ্ভুত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল, যা মূলত ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির খবর চেপে রাখার একটি অপকৌশল ছিল বলে মনে করা হয়। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মূল্যস্ফীতির ডেটা প্রকাশের আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন লাগত।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বিবিএস এখন থেকে ছয়টি আলাদা শাখার অধীনে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সমন্বয়ে ‘শাখাভিত্তিক কারিগরি পরামর্শ কমিটি’ গঠন করবে। এই কমিটিগুলোর গঠনশৈলীই বলে দিচ্ছে যে, তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় সরকার একা নয়, বরং একাডেমিক এবং বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

কৃষি শাখা: ১৪ সদস্যের এই কমিটিতে ব্র্যাক, বিআইডিএস, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন। কৃষি উৎপাদন ও শুমারির তথ্য এই কমিটির যাচাই শেষে ডিজি প্রকাশ করবেন।

জনশুমারি ও স্বাস্থ্য শাখা: ১৩ সদস্যের এই কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ, আইসিডিডিআর,বি এবং নিপোর্টের বিশেষজ্ঞরা সরাসরি ভূমিকা রাখবেন।

জাতীয় আয়-ব্যয় ও শিল্প শাখা: এখানেও ১৭ ও ১৪ সদস্যের আলাদা কমিটি থাকছে যারা জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের শ্রমশক্তির উপাত্ত বিশ্লেষণ করবে।

এই কাঠামোর ফলে কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তি বা আমলা নিজের খেয়ালখুশি মতো তথ্যে পরিবর্তন আনতে পারবেন না।

সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, মন্ত্রীর ফাইলবন্দি থাকার যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল, তা দূর হলে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বাড়বে এবং মানুষ দ্রুত সঠিক চিত্র জানতে পারবে। তিনি বলেন, "ফল যদি মন্ত্রীর অনুকূলে না যায়, তবে কারসাজির ভয় থাকে। এখন সেই সুযোগ কমে আসবে।"

তবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তার মতে, বিবিএসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। নীতিমালায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ হলেও ভেতরে যদি কোনো অদৃশ্য রাজনৈতিক চাপ কাজ করে, তবে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। অর্থাৎ, বিধিমালা জারির চেয়েও বিবিএসের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

অতীতে বিবিএসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠত যে, তারা প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব নিয়ে গেলে মন্ত্রীরা সেই অঙ্ক বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির হার ‘ডাবল ডিজিট’ বা লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি দেখানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলত। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সরকারি মূল্যস্ফীতির তথ্যের কোনো মিল পাওয়া যেত না। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের মধ্যেই এই সংক্রান্ত নতুন বিধিমালাটি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন দিতে চায়। পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আশাবাদী যে, এর মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরিতে সময় কমবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে।

তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো একটি ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া সংস্থাকে পেশাদারিত্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। শুধু মহাপরিচালককে ক্ষমতা দিলেই হবে না, বরং বিবিএসের মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার মধ্যে তথ্যের সততা বজায় রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

বিবিএসকে মন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু এটি কেবলই সূচনামাত্র। সঠিক তথ্য না থাকলে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যেমন ভুল পথে পরিচালিত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষও বিভান্ত হয়। পরিসংখ্যানের এই ‘শৃঙ্খল’ মুক্তি কি সত্যিই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক সংকট এবং উন্নয়নের সঠিক আয়না হয়ে উঠবে? এর উত্তর মিলবে আগামী শুমারি ও সূচক প্রকাশের সময়গুলোতে।

এএন

Link copied!