বিশেষ প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে এবং তাঁর ৪৯ সদস্যের বিশাল মন্ত্রিসভাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। তবে এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই জনপ্রিয় মুখ নুরুল হক নুর এবং জোনায়েদ সাকি। দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতার মসনদে ফেরা বিএনপির এই মন্ত্রিসভায় অ-বিএনপি ঘরানার দুই তরুণ ও প্রগতিশীল নেতাকে স্থান দেওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত কৌশলী ও সুদূরপ্রসারী ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় ডাক পাওয়া এই দুই নেতা প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত নুর এখন দেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই ৩৪ বছর বয়সী নেতার জনপ্রিয়তা মূলত দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা জোনায়েদ সাকি এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ৫২ বছর বয়সী সাকি অনেক দিন ধরেই রাজপথের আন্দোলনে বিএনপির সাথে একাত্ম ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহানের মতে, এই নিয়োগগুলো মূলত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদারদের ‘পুরস্কৃত’ করার একটি মাধ্যম। একইসাথে এটি ২০২৪-এর ‘জুলাই বিপ্লবের’ প্রতি নতুন সরকারের এক ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
-20260219054040.jpg)
পূর্ণ মন্ত্রিত্ব না দিয়ে তাদের প্রতিমন্ত্রী বা ‘জুনিয়র মিনিস্টার’ করার মাধ্যমে তারেক রহমান ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। এর ফলে একদিকে যেমন মিত্রদের সন্তুষ্ট করা গেছে, অন্যদিকে দলের সিনিয়র নেতাদেরও অসন্তুষ্ট হতে হয়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানের মূল কারিগর ছিল শিক্ষার্থীরা। নুর ও সাকি সেই স্পিরিটের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মন্ত্রিসভায় রাখার মাধ্যমে তারেক রহমান সাধারণ মানুষকে এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, নতুন সরকার ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রনেতাদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এখন প্রধান বিরোধী শক্তি। নুর ও সাকিকে সরকারে টেনে নিয়ে তারেক রহমান মূলত বিরোধী শিবিরের ঐক্যকে ‘লন্ডভন্ড’ করে দিয়েছেন। এখন এনসিপি বা জামায়াত রাজপথে বড় কোনো আন্দোলন করতে চাইলে নুর ও সাকির মতো জনপ্রিয় নেতারা সরকারের পক্ষে ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারবেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবার জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছিল। তবে তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায়নি। ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা মাত্র ৬টিতে জয়লাভ করেছে।
-20260219054137.jpg)
এনসিপি-র আহ্বায়ক এবং নবনির্বাচিত এমপি নাহিদ ইসলাম এখন সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসবেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ সংসদ সদস্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, এনসিপি এবং জামায়াত এখন সংসদ ও রাজপথ—উভয় জায়গাতেই বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। তবে নুর ও সাকির মতো নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা বিএনপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা দেবে, যদিও এর বিনিময়ে নুর-সাকিদের দলগুলোকে হয়তো বিএনপির ‘অনুসারী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে।
তারেক রহমানের সরকার কেবল ক্ষমতায় বসেনি, তারা একটি গণভোটের ম্যান্ডেট নিয়েও এসেছে। ভোটাররা ‘জুলাই চার্টার’ অনুমোদন করেছে, যা প্রধানমন্ত্রীকে দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় না থাকা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মৌলিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য করবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে সংস্কারের বীজ বপন করে গেছেন, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভাকে এখন তা ফলপ্রসূ করতে হবে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে এই মন্ত্রিসভার ‘অ্যাসিড টেস্ট’।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে প্রধান বাধা হলো অতীতের বিতর্ক। ২০০১-০৬ মেয়াদের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার স্মৃতি এখনো জনমনে অমলিন। আল জাজিরা উল্লেখ করেছে যে, তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসনে থেকে নিজেকে বদলেছেন এবং তাঁর দলকেও একটি আধুনিক, উদার গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।
-20260219054245.jpg)
আজকের মন্ত্রিসভা গঠনে ‘প্রবীণ-নবীন’ এবং ‘মেধা ও রাজনীতি’র যে সংমিশ্রণ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে তিনি খুব সাবধানে পা ফেলছেন। বিশেষ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে আনা এবং সালাহউদ্দিন আহমদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া একটি স্থিতিশীলতার সংকেত দিচ্ছে।
আজকের দিনটি শেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ এখন তারেক রহমানের করতলগত। এনসিপির ছাত্রনেতারা যখন বিরোধী দলে বসে তর্জনী তুলছেন, তখন নুর ও সাকির মতো সহযোদ্ধাদের পাশে নিয়ে তারেক রহমান এক বিশাল ‘প্রতিরক্ষা ব্যুহ’ তৈরি করেছেন। এই ‘তারেক ঝড়’ কেবল বিরোধীদের লন্ডভন্ড করেনি, বরং বাংলাদেশের গতানুগতিক ক্ষমতার রাজনীতির চিত্রই বদলে দিয়েছে।
পুরানো ফ্যাসিবাদের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে এক নতুন ও ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়ার যে যাত্রা আজ শুরু হলো, তার সাফল্যের চাবিকাঠি এখন এই ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার হাতে। কালকের সকালটি হবে এক নতুন পরীক্ষার, যেখানে তারেক রহমানকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কেবল বিজয়ী হতে জানেন না, তিনি সুশাসন দিতেও সক্ষম।
এএন