নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০২:১২ পিএম
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে বর্তমান সরকার। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবারের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চালু হওয়া 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রকল্পে আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি তালিকাভুক্ত পরিবার মাসে সরাসরি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবে, যা দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতির চিত্র বদলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমবার সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিশাল বাজেটের রূপরেখা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, এটি কেবল একটি সাধারণ ভাতা কর্মসূচি নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার একটি জাতীয় অঙ্গীকার।
বাজেটের বিশালত্ব ও পঞ্চবার্ষিকী প্রাক্কলন
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের পরিধি প্রতি বছর ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। ৫ বছরে মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে '১ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর একটি বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
বিশাল এই বাজেটের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা সরাসরি দরিদ্র মা ও বোনেদের হাতে নগদ হিসেবে পৌঁছে যাবে। বাকি টাকা ব্যয় হবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাটাবেজ তৈরি, ডিজিটাল কার্ড প্রদান এবং মাঠ পর্যায়ের জরিপ কাজে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘মানবিক উদ্যোগ’
গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে অবহেলিত নারীপ্রধান পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তিনি ইতিমধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারের হাতে কার্ড তুলে দিয়েছেন। বর্তমানে আরও ৪৮ হাজার জনকে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'এটি আমাদের সরকারের একটি মানবিক ও দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ। আমরা চাই প্রতিটি টাকা যেন সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আমাদের অগ্রাধিকার, এবং এর জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের কোনো ঘাটতি রাখা হবে না।
প্রকল্পের শুরুতে যেন কোনো অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং প্রকৃত দুস্থরা যেন বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে বিশেষ জরিপ চালিয়ে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
তদারকি ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য:
১. ইউএনওর নেতৃত্ব: উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রধান করে একটি শক্তিশালী বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নজরদারি:তালিকার ভুলত্রুটি সংশোধন ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরাসরি তদারকি করবে।
৩. ডিজিটাল ডাটাবেজ:অনলাইন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে দ্বৈততা বর্জন করা হবে।
৪. লোকবল বৃদ্ধি: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতি নির্ধারকরা। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চলমান অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সাথে একে সমন্বয় করে একটি সুসংহত ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এই উদ্যোগকে 'প্রশংসনীয়' বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, 'এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে নিজস্ব উৎস থেকে। স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করতে পারলে এটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে গেম-চেঞ্জার হবে।
মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি হাতে পাওয়ার ফলে একজন নারীপ্রধান পরিবার বছরে ৩০ হাজার টাকার আর্থিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন। এতে করে কেবল ওই পরিবারের খাদ্য বা চিকিৎসার চাহিদা মিটছে না, বরং গ্রামীণ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ছে। সরকার মনে করছে, আগামী ২০২৯-৩০ নাগাদ যখন ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে, তখন দেশের জিডিপিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি পাতা ধরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যে সম্ভব, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রকল্প তার এক অনন্য উদাহরণ। নদীমাতৃক এই দেশে যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লবের ডাক দেওয়া হয়েছে, তেমনি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
দেশের মানুষের কাছে এই প্রকল্প কেবল একটি কার্ড নয়, বরং দুর্যোগের দিনে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনগণের আস্থা আর সরকারের সদিচ্ছার এই মেলবন্ধনই আগামীর স্বনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি।
এএন