আমার সংবাদ ডেস্ক
জুলাই ৪, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ (ক্যারেজ) সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের মাধ্যমে যাত্রীসেবা সম্প্রসারণে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব তথ্য জানান।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে রেলওয়েকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে রেলওয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ইঞ্জিন ও কোচের ঘাটতি। এ কারণে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন রেললাইন নির্মাণ হলেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে নতুন ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ভারত থেকে প্রায় ২০০টি ব্রডগেজ কোচ ও ইঞ্জিন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো হাতে এলে ব্রডগেজ লাইনে বিদ্যমান সংকট অনেকটাই দূর হবে। তবে মিটারগেজ অঞ্চলে এখনও বড় ধরনের চাপ রয়েছে। মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত ওই অঞ্চলে যাত্রীসেবায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব হবে না। এ সংকট নিরসনে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হাবিবুর রশিদ বলেন, ভবিষ্যতে নতুন রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় করেই ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহ করা হবে, যাতে রেলপথ চালুর সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা যায়।
রেলওয়ের নতুন প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) চলছে এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া নতুন রেললাইন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার কাজও চলমান রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মধ্যে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তিনি আরও জানান, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে আশপাশের জেলার রেল যোগাযোগ জোরদারে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ভাঙ্গাসহ আশপাশের এলাকায় কমিউটার ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ সকালে ঢাকায় এসে কাজ শেষে আবার বিকেলে নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পূর্বে আমদানিকৃত ডেমু ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়েও সরকার নতুনভাবে চিন্তা করছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেরামতের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এগুলো সচল করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রেলওয়ের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্টেশনকে বাণিজ্যিকভাবে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। হাবিবুর রশিদ বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক যাত্রীসেবা, উন্নত অপেক্ষাকক্ষ, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং স্টেশন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে নতুন ইঞ্জিন ও কোচে যাত্রীদের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা চালুর বিষয়েও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রথমে রেলের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা হবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয় ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা হবে।
নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, সারাদেশের রেল লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের জন্যও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রেলপথের গেজ ব্যবস্থার বিষয়ে হাবিবুর রশিদ বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হচ্ছে ধীরে ধীরে পুরো রেল নেটওয়ার্ককে ব্রডগেজে রূপান্তর করা। যেখানে প্রয়োজন সেখানে ডুয়েল গেজ রাখা হবে। এতে পরিচালন ব্যয় কমবে এবং রেল পরিচালনা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
আন্তঃনগর ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাতায়াতের (স্ট্যান্ডিং টিকিট) বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে না। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক সময় স্ট্যান্ডিং টিকিট দিতে হয়। একজন যাত্রী এসি চেয়ারে বসে যাবেন, আর তার মাথার ওপর আরেকজন দাঁড়িয়ে থাকবেন, এটি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা এত বেশি যে অনেক সময় এ ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নতুন ইঞ্জিন, কোচ ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হলে যাত্রীসেবা আরও বিস্তৃত হবে, অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং স্ট্যান্ডিং টিকিটের প্রয়োজনও ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে রেলসেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণ নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ, উন্নত স্টেশন, নিরাপদ অবকাঠামো এবং মানসম্মত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করা।
জেএইচআর