নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ৭, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। এই প্রথম দেশের কোনো সরকারপ্রধান সশরীরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকা পরিদর্শন করলেন এবং মাঠপর্যায়ে সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক ও অন্তরঙ্গ সফর সেনা সদস্যদের মাঝে বিপুল উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী কোনো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছাড়াই মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের অধীনস্থ ৮ বীর (৮ বেঙ্গল) রেজিমেন্টের গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকায় পৌঁছান। সেখানে তিনি সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটে প্রশিক্ষণ এলাকার একটি বিশাল অংশ পরিদর্শন করেন এবং দায়িত্বরত সেনাকর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিকদের খোঁজখবর নেন।
রণকৌশল ও যুদ্ধপ্রস্তুতি পরিদর্শন
পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৮ বীর রেজিমেন্টের সুদৃঢ় ঘাঁটির (firm base) বিভিন্ন সেকশন ঘুরে দেখেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) এবং ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার (সিও) প্রধানমন্ত্রীকে মাঠপর্যায়ের চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সামগ্রিক কৌশলগত প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন।

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মনোযোগের সাথে একজন মাঠপর্যায়ের কমান্ডারের মৌখিক যুদ্ধকালীন অপারেশনাল অর্ডার (Operational Order) শোনেন। এরপর সেনা সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত রেইড (Raid) বা আকস্মিক আক্রমণ মহড়া প্রত্যক্ষ করেন।
বাস্তবমুখী যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণের বিভিন্ন দিক, যেমন- সৈনিকদের অবস্থান (Troop Positioning), রণকৌশল, অত্যাধুনিক অস্ত্রের কার্যকর ব্যবহার এবং অপারেশনাল রেডিনেস বা তাৎক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সরকারপ্রধান। প্রশিক্ষণের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য তিনি স্বয়ং একটি আর্টলারি/ইনফ্যান্ট্রি বাংকারে প্রবেশ করেন এবং সেখানে অবস্থানরত অফিসার ও সৈনিকদের সাথে রণকৌশলগত বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
গাছের আড়ালে ছদ্মবেশে সৈনিকদের পাশে প্রধানমন্ত্রী
মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ছদ্মবেশে (Camouflage) থাকা সৈনিকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ। ঘন গাছপালা এবং পাতার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখে যুদ্ধকালীন মহড়ায় ব্যস্ত থাকা সৈনিকদের কাছে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি অত্যন্ত পরম মমতায় তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার খোঁজখবর নেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত এই বীর সৈনিকদের কর্তব্যনিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে আরও উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেন।
সৈনিকদের সাথে মাঠের রেশন ও চা চক্র
দুপুরের দিকে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ সৈনিকদের জন্য তৈরি মাঠপর্যায়ের ফ্রেশ রেশন (Field Rations) খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দেশের সরকারপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও প্রটোকলের বেড়াজাল ভেঙে তিনি খোলা মাঠে বসে সৈন্যদের সাথে একই খাবার গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাদের সাথে চা চক্রে মিলিত হন।

দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবককে এভাবে নিজেদের মাঝে এত দীর্ঘ সময় ধরে একদম সাধারণের মতো পাশে পেয়ে উপস্থিত সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সৈনিকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এভাবে মাঠপর্যায়ে এসে তাদের সাথে বসে খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় কাটানো শুধু ঐতিহাসিকই নয়, বরং এটি তাদের মনোবলকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য
মহড়া পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত সকল স্তরের সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি রয়েছে গভীর আস্থা, অবিচল বিশ্বাস ও ভালোবাসা। জাতীয় যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমাদের সেনাবাহিনী সবসময় গৌরবোজ্জ্বল ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের রূপান্তরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। এর জন্য পেশাদার প্রশিক্ষণ, কঠোর শৃঙ্খলা এবং সর্বোচ্চ স্তরের যুদ্ধপ্রস্তুতি বজায় রাখা অপরিহার্য। তিনি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক ও আকস্মিক পরিদর্শনের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রনায়কের এই ধরনের মাঠপর্যায়ের অংশগ্রহণ ও তদারকি সশস্ত্র বাহিনীর চেইন অব কমান্ডকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সৈনিকদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে অনুপ্রাণিত করবে।
এএন