ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

অল্প বয়সে প্রেম-বাল্যবিয়ে: পরিত্রাণের উপায় কোথায়?

বিশেষ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি

অক্টোবর ৩, ২০২৫, ০৫:৫৭ পিএম

অল্প বয়সে প্রেম-বাল্যবিয়ে: পরিত্রাণের উপায় কোথায়?

বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল, দাখিল মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে অল্প বয়সী মেয়েদের প্রেমের প্রবণতা। ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা, যারা মাত্র ১৩ থেকে ১৫ বছরের কিশোরী, তারাই এখন প্রেমে জড়িয়ে পড়ছে।

অথচ এই বয়সে প্রেমের প্রকৃত অর্থ বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই। এতে যেমন তাদের পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি পরিবারের সম্মানও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অনেকে আবার কলঙ্ক এড়াতে বাধ্য হয়ে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন, যা থেকে শুরু হচ্ছে বাল্যবিবাহ ও অকাল মাতৃত্বের মতো ভয়াবহ সমস্যা।

একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আগে এরকম ছিল না। এখন ছোট ছোট মেয়েরা খুব বেপরোয়া হয়ে পড়ছে। অভিভাবকেরা সন্তানদের দিকে যথেষ্ট নজর রাখছেন না। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অবাধ মেলামেশার কারণে এই প্রবণতা বেড়েছে।”

কেন অল্প বয়সে প্রেমে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরীরা?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অল্প বয়সে প্রেমে পড়ার পেছনে নানা কারণ আছে।

পরিবারে পর্যাপ্ত স্নেহ-ভালোবাসার অভাব

অনেক বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান না। ফলে মেয়েরা আবেগী হয়ে পড়ে এবং বাইরের কারও প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মধ্যে ‘ভার্চুয়াল সম্পর্ক’ তৈরি করছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দ্রুত প্রেমে রূপ নেয়।

সচেতনতার অভাব

এই বয়সে প্রেমের অর্থ কী, এর পরিণতি কী হতে পারে—তা কিশোরীরা বোঝে না। ফলে তারা তাৎক্ষণিক আবেগে সিদ্ধান্ত নেয়।

স্কুলে ও সমাজে পরিবেশগত প্রভাব

বন্ধুদের প্রভাব, গ্রুপিং, অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রেমের কাহিনি ও নাটক-সিনেমার প্রভাবও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

প্রেম থেকে বাল্যবিবাহ: এক বিপজ্জনক পরিণতি

গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, যখন কোনো কিশোরীরা প্রেমে পড়ে, তখন বাবা-মা সমাজের কলঙ্কের ভয়ে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন। ফলে মাত্র ১৩–১৫ বছরের মেয়েরাও অকাল বিয়ের শিকার হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ নারী ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এর বড় অংশই গ্রামাঞ্চলে।

বাল্যবিবাহের পরিণতি ভয়াবহ— মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মা ও নবজাতক উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে অকাল মৃত্যু ঘটে ও সামাজিকভাবে কিশোরীরা স্বপ্ন হারিয়ে গৃহবন্দি জীবনে পড়ে যায়।

অকাল মাতৃত্বের ভয়াবহতা

যেসব কিশোরীর অল্প বয়সে বিয়ে হয়, তারা খুব দ্রুত মা হয়ে যায়। অথচ তখনো তাদের শরীর সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। ফলাফল— শিশু অপুষ্টির শিকার হয়। মায়ের শরীরে পুষ্টির অভাব তৈরি হয়। অনাগত শিশুর ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মাতৃমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হলো বাল্যবিবাহজনিত অকাল গর্ভধারণ।

একজন গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “এখনকার কিশোরীরা খুব সহজে প্রেমে জড়িয়ে যায়। তারা জানেই না প্রেম আসলে কী। বাবা-মা যদি একটু বেশি খোঁজখবর রাখতেন, তবে এমনটা হতো না। অনেক সময় আমরা স্কুলে দেখি, ছোট ছোট মেয়েরা প্রেমপত্র আদানপ্রদান করছে। এগুলো আমাদের জন্যও বিব্রতকর।”

তিনি মনে করেন, স্কুলে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।

অভিভাবকদের দায়িত্ব কোথায়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প বয়সী সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে বাবা-মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন জীবিকার তাগিদে। সন্তানদের খোঁজখবর ঠিকমতো নেওয়া হয় না।

ফলে সন্তানরা বাইরের প্রভাবের শিকার হয়। অনেক অভিভাবক আবার সন্তানদের মোবাইল ফোন দিয়ে দেন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া, যা সমস্যা আরও বাড়াচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন,“অল্প বয়সে প্রেমে পড়া কিশোরীরা জানেই না তারা কী করছে। তাদের চোখে এটি রোমাঞ্চকর মনে হয়। কিন্তু এর সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি ভয়াবহ। এ জন্য পরিবার, স্কুল ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন,“প্রথমেই অভিভাবককে সন্তানের প্রতি সময় দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগ করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে।”

বাল্যবিবাহ রোধে আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন রয়েছে। ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়ের বিয়ে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু গ্রামের বাস্তবতায় এখনো বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিশোরীদের সচেতন করা জরুরি

শুধু আইন করলেই হবে না, কিশোরীদের সচেতন করাও জরুরি। তাদের বুঝাতে হবে— প্রেম কোনো খেলা নয়, এর সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্য আছে। অল্প বয়সে প্রেম ও বিয়ের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

এ জন্য স্কুলে নিয়মিত সচেতনতামূলক সেশন, সেমিনার, ক্লাসে বিশেষ আলোচনার আয়োজন করা দরকার।

সমাধানের প্রস্তাবনা

পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো: বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে, তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

মোবাইল ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ: কিশোরীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

স্কুলে সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসে এসব বিষয়ে আলোচনা করবেন।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাল্যবিবাহ ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ: গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা, সামাজিক সংগঠন, এনজিও সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

কিশোর স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সিলিং: প্রতিটি উপজেলায় কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।

অল্প বয়সে প্রেম ও বাল্যবিবাহ কেবল একটি পরিবার বা গ্রামের সমস্যা নয়, বরং পুরো দেশের জন্য অশনিসংকেত। এতে একদিকে মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়ছে।

সুতরাং বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবারই দায়িত্ব এই সমস্যার সমাধান করা। সময় থাকতেই যদি কিশোরীদের সঠিক পথে ফেরানো যায়, তবে বাংলাদেশ একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও উন্নত প্রজন্ম পাবে। আর না হলে আগামীর সমাজ আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে।

একজন শিক্ষাবিদ বলেন,“অল্প বয়সে প্রেম বা বিয়ে কোনো সমাধান নয়, বরং এটা ধ্বংসের পথ। শিক্ষা ও সচেতনতাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।

এইচআর/ইএইচ

Link copied!