ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

সড়কে মৃত্যুর মিছিল, থামছে না দুর্ঘটনা

হাশেম রেজা 

হাশেম রেজা 

অক্টোবর ২৭, ২০২৫, ১১:৩৬ এএম

সড়কে মৃত্যুর মিছিল, থামছে না  দুর্ঘটনা

শহরের ভিড় পথ, গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তাও-প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার শোকাবহ সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে। একজন মা, এক শিশু, একজন ছাত্র বা কর্মজীবী মানুষ-কারওই জীবনের কদর বুঝে না সড়কের রাশ টানার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবারকে ভেঙে দেয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক প্রতিকূলতা ও মানসিক আঘাতও রেখে যায়। অথচ বহু দুর্ঘটনা অপ্রয়োজনীয়ই-সঠিক নীতিমালা, সামাজিক সচেতনতা ও প্রাঞ্জল পরিকাঠামো থাকলে এদের বড় অংশ রোধ করা সম্ভব। 

এই উপ-সম্পাদকীয়তে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না, কী কারণ ও চ্যালেঞ্জ বিরাজমান এবং বাস্তবসম্মত, অগ্রগামিতা পূর্ণ সমাধান কী হতে পারে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিচারে আমরা সংখ্যাকে অস্বীকার করতে পারি না: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, প্রতি বছর লক্ষান্তরে মানুষ সড়ক দূর্ঘটনার বলি হয়; তাদের মধ্যে অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের রাস্তায় ঘটে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, গত কয়েক দশকে যানবাহন বাড়লেও সড়ক নিরাপত্তার বিনিয়োগ, শিক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা সমানুপাতে বাড়েনি। ফলে রুক্ষ রাস্তাঘাট, দুর্বল ট্রাফিক সংস্কৃতি, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ও জরুরি সেবা অনিয়মিত-সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা বাড়ায়। তদুপরি, দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা পৌছানো দেরি হলে প্রাণহানি বাড়ে; দুর্যোগ-পরিচালনা ব্যবস্থা দুর্বল থাকাও সমস্যাকে জোরালো করে।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বহুবিধ ও পারস্পরিক জড়িত। প্রধান কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

দুর্বল অবকাঠামো ও রাস্তাঘাটের অবস্থা: অনেক পশ্চাতে থাকা এলাকায় রাস্তাগুলো সংকীর্ণ, আলোকিত নয়, সাইনবোর্ড বা গার্ড্রেইল নেই। বৃষ্টি বা বন্যায় রাস্তায় ধীরগতিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের গুণগত মান যেভাবে অবনতি হয়, ফোর-লেইন, চওড়া ফুটপাত, ওয়ার্টিং নিদর্শন না থাকলে, দুর্ঘটনা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আইন-শৃঙ্খলার অভাব ও কম প্রয়োগ: গতানুগতিকভাবে ট্রাফিক আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তব কার্যকরতা অনুপযুক্ত। নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা বা লাইসেন্স-প্রসেস দুর্বল হলে মানুষ সহজেই নিয়ম ভাঙে। উক্ত ভঙ্গগুলোর জন্য যথাযথ দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে পুনরাবৃত্তি ঘটে।

মানবীয় ত্রুটি-অবহেলা, অভ্যাস ও অদক্ষতা: অবহেলা, অতি-গতি, মাতাবাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে চালানো, সিটবেল্ট বা হেলমেট না ব্যবহার-এসব মনুষ্য-জাতীয় কারণও প্রধান ভূমিকা রাখে। ট্রাফিক সংস্কৃতি না গড়ে উঠলেও বিধি অমান্য সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে।

অপর্যাপ্ত ট্রেনিং ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সিস্টেম: অনেক ক্ষেত্রেই ড্রাইভিং লাইসেন্স সহজলভ্য ও অনুদৈর্ঘ্য প্রক্রিয়া ছাড়া দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মান কম হলে নতুন ড্রাইভারদের দক্ষতা অপর্যাপ্ত থাকে-এটি বিপজ্জনক এক বাস্তবতা।

অসহায় জরুরি সেবা ও প্রাথমিক চিকিৎসার অনুপস্থিতি: দুর্ঘটনার পর সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও হাসপাতালে স্থানান্তর অনেক ক্ষেত্রে না হলে শয্যাশয্য প্রাণও হারায়। এম্বুল্যান্স সেবা, ট্রান্সপোর্টযোগ্যতা ও ট্রমা সেন্টার অপর্যাপ্ত থাকায় মৃত্যুহার বাড়ে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি: চাকরির তাগিদে দ্রুতগামী পরিবহন ব্যবহারের চাপ, মাঝরাস্তায় যাত্রী উঠানামা, মালবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহনের সংমিশ্রণ-এসবও ঝুঁকি বাড়ায়।

সমাধান: সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য কেবল একটি সেক্টরে কাজ করা হবে না; দরকার সমন্বিত- অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা, প্রযুক্তি ও জরুরি সেবার সমন্বয়। কিছু বাস্তবনীতি ও নীতি-সঙ্গত সুপারিশ নিচে দেওয়া হলো:

রাস্তাঘাটের মানোন্নয়ন: প্রধান ও মাধ্যমিক রুটগুলোকে দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা; যথাযথ ড্রেন, গার্ড্রেইল, ফুটপাত ও বাইক লেন নিশ্চিত করা। গ্রামীণ রাস্তায়ও ডাস্টার কভারিং, ব্রিজিং ও চওড়া করণ জরুরি।

ট্রাফিক শান্ত অঞ্চল (Traffic Calming): স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় স্পিড ব্রেকার, রেডিয়াল রাউন্ডঅ্যাবে, চিহ্নিত ক্রসওয়াক ইত্যাদি স্থাপন করা। পথচারীকে রক্ষা করার উপায় তৈরি করা।

রাস্তায় আলো ও সাইনেজ: যথাযথ রাস্ট্রিক উপাত্তভিত্তিক রোড সাইন, রাস্তা আলোকসজ্জা ও রিয়া-সুরক্ষা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।

ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন: স্পিডিং, ওভারলোডিং, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালনা-এসব বন্ধে কড়া অভিযান করা। আইন-মাফিয়া ও অনিয়মজনিত দূর্নীতি রোধ করতে স্বচ্ছ মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন।

ট্রাফিক পুলিশকে উৎসাহিত ও পেশাদার করা: আধুনিক সরঞ্জাম, ট্রেনিং ও অনুপ্রেরণা দিয়ে ট্রাফিক পুলিশ কর্মক্ষমতা বাড়ানো।

দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা: দুর্ঘটনায় দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য ট্রান্সপোর্ট কোর্ট বা ফাস্ট-ট্র্যাক সিস্টেম গঠন করা যেতে পারে।

প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স সংস্কার: ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার আগে কঠোর তত্ত্ব ও পারফরম্যান্স-ভিত্তিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা; নিয়মিত রি-ফ্রেশার ট্রেনিং ও চালকের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চালু রাখা।

রোড সেফটি ক্যাম্পেইন: বিদ্যালয়, কলেজ, কাজের স্থানে ও গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে রোড সেফটি সচেতনতা বাড়াতে হবে: হেলমেট পরিধান, সিটবেল্ট, গতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

কোম্পানি ও পরিবহন মালিকদের জবাবদিহিতা: বাস ও ট্রাক মালিকদের নিয়মিত ড্রাইভার ট্রেনিং ও বিশ্রাম সময় নিশ্চিত করতে হবে; ওভারটাইম বা জরুরি চাপ তাদের ওপর তুলে না দেয়া শ্রেয়।

স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম: সিগন্যাল অপটিমাইজেশন, স্পিড-ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই/আইওটি-ভিত্তিক ট্রাফিক মনিটরিং-এসব প্রযুক্তি দুর্ঘটনা ও স্পিডিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।

ডেটা-ভিত্তিক পকেট কন্ট: দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গার হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোতে ফোকাস করা; সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ করে তদারকি বাড়ানো।

এপ্স ও ডিজিটাল সেবা: নাগরিকরা দুর্ঘটনা বা ঝুঁকি দেখলে দ্রুত রিপোর্ট করতে পারবে এমন প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারঅ্যাকটিভ সেবা গড়ে তোলা।

ট্রমা সে-নটর ও এম্বুল্যান্স নেটওয়ার্ক: প্রতিটি জেলায় ট্রমা কেয়ার ইউনিট স্থাপন; এম্বুল্যান্স মান ও দ্রুততার নিশ্চয়তা; হটলাইন সার্ভিস কার্যকর করা।

প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: গণমানসে ‘বাই-স্ট্যান্ডার’ প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ চালু করা; স্কুল-কলেজ ও কমিউনিটিতে CPR এবং বেসিক ট্রমা কেয়ার শেখানো।

রোগী পরিবহন ও হাসপাতালে স্থানান্তর: দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিকটস্থ হাসপাতালে দ্রুত ও সুষ্ঠু পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

রোড সেফটি ন্যাশনাল প্ল্যান: দীর্ঘমেয়াদি ন্যাশনাল রোড সেফটি রোডম্যাপ তৈরি করে, বাজেট বরাদ্দের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পরিকল্পনায় স্থানীয় সম্প্রদায়, এনজিও ও প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

বীমা ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা: আঘাতপ্রাপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ট্রান্সপোর্ট ইন্স্যুরেন্স ও গণবীমা নীতি চালু করা যেতে পারে।

নিয়ম শুধুমাত্র আইনগত নয়, নিয়ম মান্য করা মানে দাঁড়ায় সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন। শিশুকাল থেকেই ট্রাফিক আচরণ শিক্ষা দিতে হবে-স্কুলে সুরক্ষাভিত্তিক পাঠ্যসূচি, পরিবারে অভ্যেস এবং গণমাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক প্রচার। চালককে নিয়ম ভাঙলে সামাজিক নিন্দা-অভিযোগ প্রয়োগ করলে বারবার আইন ভঙ্গের মনোভাব কমে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও উদ্যোগী হয়ে রোড সেফটি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

অটোনোমাস ড্রাইভিং, ADAS (Advanced Driver Assistance Systems), ইলেকট্রিক ভেহিকলগুলোর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য-এসব প্রযুক্তি সড়ক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা দেখতে হবে-প্রাথমিকভাবে স্পিড-সেন্সর, হার্ডব্রেক অ্যালার্ম, ব্যাক্রাডার ও ক্যামেরা-ভিত্তিক কন্ট্রোল দ্রুত ফলপ্রসূ হবে।

গণপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিওরা কমিউনিটিতে রোড সেফটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে-স্থানীয় হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার, পথচারী সুরক্ষা উদ্যোগ ও অবচেতন ট্রাফিকের বিরুদ্ধে লড়াই। স্কুলছাত্র-ছাত্রী, কলেজবয়স্ক ইয়ুথ ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণে নিয়ে ছোট-ছোট অভিযানের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব-কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইলিউশনে ভর করে করা যাবে না। প্রয়োজন সাহসী নীতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসচেতনতা ও অর্থায়নের সুষম মিশ্রণ। প্রতিটি প্রাণ অনুপম; একটি পরিবারের ভাঙন, কর্মক্ষম জনশক্তির ক্ষতি বা মৃত ব্যক্তির জন্য শোক-এসব নিয়মিত মৃত্যুর সংখ্যা নয়, একেকটি সমাজের ক্ষতি। আমরা যদি আজই সিদ্ধান্ত নেই-রাস্তাগুলোকে নিরাপদ করে তোলা হবে-প্রতিটি স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকা রক্ষিত হবে-লাইসেন্স ও ড্রাইভিং সংস্কার করা হবে-জরুরি সেবা শক্তিশালী করা হবে-তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রিহ্যাবিলিটেড ও নিরাপদ সড়কের উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারব।

এখানে ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ও গুরুত্বপূর্ণ: নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, চালক-যাত্রী-প্রতিজনকে নিয়ম মেনে চলা শিখতে হবে; এতে সমাজের চেহারাই বদলে যাবে। রাষ্ট্র যদি আইন প্রয়োগে কঠোর হয় আর সমাজ যদি আচরণগত পরিবর্তনে অংশ নেয়-তাহলেই সেই মিছিল ধীরে ধীরে থামবে, আর সড়কগুলো ফিরে পাবে জীবনের গান।

শেষ করব একটি আহ্বানে, প্রতিটি পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও সামাজিক মাধ্যম এই বিষয়কে গণজাগরণীয় হিসেবে তুলি ধরুক, রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা কাগজে নয়, মাঠে কাজ করে এটা জানান। কারণ প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান, আর প্রতিটি নিরাপদ রোজগার, ক্লাসে আসা ছাত্রী, কর্মস্থলে যাওয়া ব্যক্তি-এসবই আমাদের দেশের প্রকৃত উন্নয়নের চিহ্ন।

জেএইচআর

Link copied!