ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

শিক্ষার মান উন্নত জাতির মূল পরিচয়

হাশেম রেজা

হাশেম রেজা

ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ০৪:০০ পিএম

শিক্ষার মান উন্নত জাতির মূল পরিচয়

শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জাতীয় উন্নতির করণীয়। টেকসই অগ্রগতির পথে প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক উন্নয়নের রূপরেখা। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, এই মন্ত্রটি কেবল কোনো আদর্শিক বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন ও অকাট্য সত্য। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর যে যে দেশ উন্নত সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়েছে, তাদের প্রতিটি সফলতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে একটি শক্তিশালী, মানসম্মত ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। 

জাপানের পুনরুত্থান, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক বিপ্লব, মালয়েশিয়ার জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি বা ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্ভাবন নির্ভর উন্নতি, সবকিছুই শিক্ষা ব্যবস্থার শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশও উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে, মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও জরুরি, আমরা কি শিক্ষার ভিত্তিকে যথেষ্ট শক্তিশালী করতে পেরেছি। শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে সেই মেরুদণ্ড কতটা সোজা, কতটা দৃঢ়, এখনই সেই মূল্যায়নের সময়।

একটি দেশের উন্নয়নের জন্য তিনটি মৌলিক স্তম্ভ জরুরি, মানসম্পন্ন মানবসম্পদ, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞান, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনা। এই তিনটির সমন্বয় ঘটে শিক্ষার মাধ্যমেই। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিন্তা, আচরণ, কর্মদক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও নাগরিকত্ববোধ গঠন করে। তাই উন্নত রাষ্ট্র তৈরি করতে চাইলে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করতেই হবে।

বাংলাদেশে শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার ৯৭ শতাংশের কাছাকাছি, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা প্রসার, হাজারো বিদ্যালয়ে নতুন ভবন, ডিজিটাল কনটেন্ট, ই লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু মানগত দিক থেকে বেশ কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান, মানসম্মত পাঠ্যক্রম ও বাস্তব দক্ষতার অভাব। শিক্ষা বইকেন্দ্রিক, পরীক্ষাকেন্দ্রিক। বিশ্লেষণ, যুক্তি, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান, এসব কৌশল গড়ে ওঠে না। শিক্ষকের দক্ষতা ঘাটতি। 

অনেক স্থানে প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, আইসিটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। অবকাঠামোর বৈষম্য। শহর গ্রাম, ধনী গরিব, সরকারি বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য শিক্ষা সমতা নষ্ট করছে। পেশাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষার ঘাটতি। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় ছাত্রসংখ্যা মাত্র ১৫ শতাংশের মতো, অথচ উন্নত দেশে এই হার ৪৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ। গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব। বিশ্বমানে টিকতে পারে, এমন গবেষণা সুযোগ খুব সীমিত, ফলে উদ্ভাবন থেমে যাচ্ছে। শিক্ষায় রাজনীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা। পাঠদান ও একাডেমিক পরিবেশ বহু সময় অরাজনৈতিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় না।

উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষার বিকল্প নেই, কারণ শিক্ষা একটি জাতিকে যা দেয়, তা অন্য কোনো খাত দিতে পারে না। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি। দেশের শিল্প, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, কৃষি, সব সেক্টরই দক্ষ জনবল নির্ভর। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেশি সৃজনশীল, অধিক কর্মক্ষম, এবং অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। দারিদ্র্য হ্রাস। শিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং পরিবারকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে। নৈতিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। মানসম্পন্ন শিক্ষা একটি সুশৃঙ্খল ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অগ্রগতি। ডিজিটাল যুগে টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অপরিহার্য।

বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে শিক্ষা খাতে কিছু মৌলিক সংস্কার এবং বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিচে প্রস্তাবিত করণীয়সমূহ গঠনমূলকভাবে উপস্থাপন করা হলো, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন। বইকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, বিশ্লেষণী দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, দলগত কাজ, নৈতিকতা ও নেতৃত্বগুণ। ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতি, স্মার্ট ক্লাস, মাল্টিমিডিয়া রুম, অনলাইন কনটেন্ট, ভার্চুয়াল ল্যাব। শিক্ষক উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। শিক্ষক নিয়োগে কঠোর মানদণ্ড, যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সামর্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। 

নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, আইসিটি, মনস্তত্ত্ব, ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট, আধুনিক শিক্ষণ কৌশল। শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত, বেতন, সুবিধা, নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রে শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। গ্রাম শহরের বৈষম্য কমানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্পন্ন বিদ্যালয় ও প্রযুক্তি সুবিধা দিতে হবে। নিরাপদ ও সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ, পরিষ্কার শ্রেণিকক্ষ, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। 

কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণ। মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষা, সেলাই, ইলেকট্রিক, কৃষি, কম্পিউটার, গ্রাফিক্স, এসব বাস্তব দক্ষতা তৈরি করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, প্রশিক্ষণ, এসবের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা বাড়বে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ফান্ড বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ দিতে হবে। 

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি চালু করা। শিক্ষায় রাজনীতি মুক্ত ও সুশাসন নিশ্চিত। শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা উন্নত শিক্ষার পূর্বশর্ত। অভিভাবক ও সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি। সন্তানদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, অতিরিক্ত চাপ নয়, অনুপ্রেরণা ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজ কমিউনিটির ভূমিকা। স্থানীয় পর্যায়ে লাইব্রেরি, শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি চালু করা উচিত। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা বিস্তার। বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই, রোবোটিক্স, প্রোগ্রামিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স, এসব বিষয় বিদ্যালয় স্তর থেকেই পরিচিত করতে হবে।

সমগ্র বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় তা হলো, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দৃঢ়তা। শিক্ষা সমৃদ্ধ না হলে, জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হতে পারে না, জনগণ দক্ষ হয় না, গবেষণা ও উদ্ভাবনে পিছিয়ে পড়ে, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে উন্নয়নের প্রধান শক্তি, বাকি সব কিছুই এর অনুসঙ্গ মাত্র। শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে দৃঢ় রাখতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন, সুশাসন ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ অপরিহার্য। 

বাংলাদেশ তরুণপ্রধান দেশ, এখানে সঠিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন হলে এই যুবসমাজই হবে উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি। শিক্ষা জাতিকে কেবল জ্ঞানী করে না, তৈরি করে সচেতন নাগরিক, দক্ষ কর্মশক্তি, নৈতিক মানুষ এবং সুপরিকল্পিত সমাজ। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত কর্তব্য। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ চাইলে, শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, আর মানসম্মত শিক্ষাই জাতির সত্যিকারের মেরুদণ্ড।

জেএইচআর

Link copied!