হাশেম রেজা
ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫, ০৭:০৯ পিএম
সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রত্যাশা দুটিই ক্রমেই বাড়ছে। তবে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই আইন-শৃঙ্খলার অবনতির বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছে এবং অনেকের আশঙ্কা বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার প্রার্থীদের ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি না।
এ উদ্বেগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক ঘটনায়। একটি বড় রাজনৈতিক দলের একজন প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার পরও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নির্বাচনে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি এমনই থাকে, তাহলে আগামী নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে?
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহর থেকে গ্রাম, শিল্পাঞ্চল থেকে পাহাড় সবখানেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একা প্রশাসনের পক্ষে কঠিন কাজ। অপরাধ দমন, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনী নিরাপত্তা সব দায়িত্ব একযোগে পালন করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিনিয়ত চাপে থাকতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় শুধু সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দোষ চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কোনো সরকারই সফল হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাস ও সহিংসতা মূলত সমাজের ভেতর থেকেই জন্ম নেয়। অপরাধীরা সমাজেরই অংশ তাদের গতিবিধি, অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্থানীয় জনগণই সবচেয়ে বেশি জানে। কিন্তু ভয়, অনাস্থা কিংবা প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
জনগণের একটি বড় অংশ বলছে, আমরা সাহস পাই না। যদি প্রশাসন আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অবশ্যই আমরা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।এই বক্তব্যে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে অপরাধ দমন কার্যকর হয় না।
জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এ বার্তাটি স্পষ্টভাবে দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
অনেক নাগরিক মনে করেন, সরকার যদি কট্টর অবস্থান নেয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি শক্ত হাতে অপরাধ দমন করে, তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের সমস্যা হবে না। জনগণ তখন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারবে।
নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শুধু পুলিশ, র্যাব বা অন্যান্য বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়া, প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এসব কাজে জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবক দল, সুশীল সমাজ, শিক্ষক, ইমাম ও জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে এলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠলে সন্ত্রাসীরা সহজে সক্রিয় হতে পারে না।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি দলের উচিত নিজেদের নেতা-কর্মীদের সংযত রাখা, সহিংস রাজনীতি পরিহার করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে, প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়, তাহলে নির্বাচনী পরিবেশ অনেকটাই ইতিবাচক হবে।
দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে জনগণকে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপরাধ দেখেও নীরব থাকা সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করা এবং সামাজিকভাবে অপরাধীদের বর্জন করা এসবই জনগণের শক্তিশালী ভূমিকা।
একজন সচেতন নাগরিক যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে পেশাদারভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সাহস পায়।
নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনী সময়ে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা, দ্রুত বিচার ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হতে পারে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কোনো একক পক্ষের কাজ নয়। শুধু সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সর্বোপরি জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।
দেশের জনগণ যদি দেশের জন্য রুখে দাঁড়ায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা করে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাহলেই দেশের শান্তি ফিরবে। তখনই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্ভব হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এই সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের বিকল্প নেই।
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
জেএইচআর