রাজীন আহমেদ পঙ্কজ
মার্চ ৩০, ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
বাংলাদেশের মানুষ ভেবেছিল ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তত রাস্তাঘাট, বাজার, পরিবহন, ঘাট, বালুমহাল, ফুটপাত ও স্থানীয় ব্যবসায় স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- চাঁদাবাজি থামেনি; বরং বহু জায়গায় শুধু নিয়ন্ত্রণকারীর মুখ বদলেছে।
২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল দুর্নীতি মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরও মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ থামেনি।
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি পরিবহন খাত। প্রথম আলো ইংলিশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে টিআইবি’র (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, বেসরকারি বাস খাত থেকে বছরে প্রায় ১,০৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। ওই অর্থ রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ব্যক্তি, পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং অন্যদের মধ্যে ভাগ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ক্ষমতার পালাবদলের পর পরিবহন খাতেও নিয়ন্ত্রণ বদলের অভিযোগ এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়, আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পরিবহন মালিক সমিতির অফিসগুলো এখন বিএনপি-সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে গেছে বলে প্রথম আলো রিপোর্ট করেছে। একই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, অন্যান্য পরিবহন সংগঠন, বাস টার্মিনাল ও শ্রমিক ইউনিয়নের ওপরও বিএনপি-ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে।
এটি কেবল পরিবহনের সমস্যা নয়; এটি জনগণের পকেটে সরাসরি আঘাত। বাসে চাঁদা মানে ভাড়া বাড়া, ট্রাকে চাঁদা মানে পণ্যের দাম বাড়া, আর ফুটপাতে চাঁদা মানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় কমে যাওয়া। ঘাট, বালুমহাল, বাজার ও টার্মিনালে চাঁদা মানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়ে যাওয়া।
ঢাকা ট্রিবউনে রিপোর্ট করা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সহিংসতায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে; এমনকি কিছু ঘটনায় প্রাণহানির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা তখন বলেছিলেন, এসব কর্মকাণ্ড দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং দল কঠোর অবস্থানে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-কঠোর অবস্থান কোথায়?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (EUAA)-এর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএনপি নেতৃত্ব চাঁদাবাজি, দখলদারি ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের অভিযোগে এক হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সূত্রে বলা হয়েছে, টিআইবি অভিযোগ করে যে কিছু বিএনপি নেতাকর্মী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার সংস্থা এবং সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এখানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা সবচেয়ে স্পষ্ট। দলীয় বহিষ্কার বা সংবাদ সম্মেলন কোনো আসল বিচার নয়। যদি কেউ চাঁদাবাজি করে, দখল করে, মানুষকে ভয় দেখায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, তদন্ত, চার্জশিট এবং আদালতে বিচার হওয়া দরকার। দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করা যায় না।
আরও আশঙ্কাজনক হলো, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক দখলদারি নিয়ে যারা কথা বলছেন- সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট তারাও চাপের মুখে পড়ছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, বাংলাদেশে সরকার সমালোচনামূলক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে এ এম হাসান নাসিমকে একটি কার্টুন পোস্ট করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যেখানে একজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে বলা হয়।
এটি শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয় এটি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি লুকানোর পরিবেশ তৈরি করে। যখন মানুষ জানে কথা বললে মামলা হতে পারে, কার্টুন আঁকলেও গ্রেপ্তার হতে পারে, তখন চাঁদাবাজরা আরও শক্তিশালী হয়।
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সাংবাদিকদের ওপর ৩১৮টি হামলায় অন্তত ৫৩৯ জন প্রভাবিত হয়েছেন; ৩ জন সাংবাদিক নিহত, ২৭৩ জন আহত এবং ৫৭ জন চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছে, খাগড়াছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক জিতেন বড়ুয়াকে পাঁচটি পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়; যার মধ্যে কয়েকটি মামলা বিগত রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও অস্থিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাইত, তাহলে প্রথম কাজ হতো অভিযোগকারী, সাংবাদিক ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন, তারাই অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। টিআইবি-ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার মতো বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে এবং সরকারকে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছে।
বাস্তবতা নির্মম: ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু চাঁদাবাজির কাঠামো বদলায়নি। পতাকা বদলেছে, কিন্তু টার্মিনাল দখলের রাজনীতি বদলায়নি। নেতা বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট কাটা বন্ধ হয়নি।
যে সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়, তার শাসনে যদি পরিবহন, বাজার, ঘাট, ফুটপাত ও স্থানীয় ব্যবসায় চাঁদাবাজি চলতেই থাকে, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা। বাংলাদেশের মানুষ কোনো দলের চাঁদাবাজি মেনে নিতে বাধ্য নয়। পূর্ববর্তী সরকারের চাঁদাবাজি যেমন অপরাধ ছিল, বর্তমানের নামে চাঁদাবাজিও সমান অপরাধ। দলীয় পরিচয় অপরাধের লাইসেন্স হতে পারে না।
আজ সবচেয়ে জরুরি তিনটি কাজ: চাঁদাবাজির প্রতিটি অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেপ্তার ও বিচার, এবং সাংবাদিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ চাঁদাবাজি শুধু টাকা নেয় না, এটি মানুষের মর্যাদা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কেড়ে নেয়। আর যে রাষ্ট্র চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, সে রাষ্ট্র জনগণের নয় সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি রাষ্ট্র।