Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

সেতু ও বিআরটিএ ভবন ‘গলার কাঁটা’

মহিউদ্দিন রাব্বানি 

মহিউদ্দিন রাব্বানি 

মে ১৭, ২০২২, ০২:৩৪ এএম


সেতু ও বিআরটিএ ভবন ‘গলার কাঁটা’

নাগরিক জীবনে যানজট এখন নিত্যসঙ্গী। রাজধানীর প্রতিটি সড়ক কিংবা অলিগলি সবখানেই যানবাহনের তীব্র চাপ। প্রচণ্ড গরম আর অসহনীয় বাহনজটে দিনভর নাকাল নগরবাসী। এই যানজটের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়কের অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত সরকারি-বেসরকারি ভবন নির্মাণ। 

রাজধানীর মহাখালীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে সেতু ভবন ও বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) ভবন এখন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ দুটি ভবনের কারণে সড়কটি চওড়া করা যাচ্ছে না। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এতে মহাখালী উড়াল সড়কে গাড়ি উঠতে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দিনভর এ সড়কে যানজট লেগেই থাকে। 

সেখানে ইউটার্ন নির্মাণ করেও তার সুফল মিলছে না। এ কারণে বিভিন্ন মহল থেকে ভবন দুটি অন্যত্র সরিয়ে ফেলার দাবিও তোলা হয়। বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন নবনির্মিত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন ও বিআরটিএ  ভবন ভেঙে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন-ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম। যানজট সঙ্কট নিরসনে ইতোপূর্বে রাজধানীতে পরিবেশ বা নাগরিকদের সুবিধার্থে কারওয়ান বাজারের বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলে হয়েছে।

চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন ইউলুপটি কাজে না আসার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সড়কের জায়গায় সেতু ভবন ও বিআরটিএ ভবন নির্মাণ। এখন এই দুটি ভবনের জন্য সড়কটি সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। ফলে ইউলুপ করার পরও গাড়ি ঘুরতে পারছে না। এই কারণে মহাখালী ও তার আশপাশের এলাকার সড়কে গাড়ি উঠতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মেয়র আতিকুল ইসলাম জানান, রাজধানীর যানজট নিরসনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন-ডিএনসিসি ১১টি ইউলুপ নির্মাণ প্রকল্পটি প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক শুরু করেন। এখনো প্রকল্পটির কাজ চলছে। কিন্তু সড়ক পর্যাপ্ত চওড়া না হওয়ায় এই ইউলুপগুলো কাজে আসেনি। বিশেষ করে বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন একটি ইউলুপ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকার ইউলুপটি সুফল মেলেনি। 

তিনি জানান, আগে হাঁটার জন্য চওড়া ফুটপাত বা বেড়ানোর জন্য ফাঁকা জায়গা ছিল। এখন সেই খালি জায়গা আর নেই। সেতু কর্তৃপক্ষ সেখানে অপরিকল্পিতভাবে কংক্রিটের বহুতল স্থাপনা তৈরি করেছে। ঢাকার যানজট নিরসনে নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকার যানজট কমাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো থেকে হকারদের সরিয়ে দেয়া, তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেয়া। তারা আরও পরামর্শ দেন ঢাকার প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলবাস চালু করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার সীমিত করতে হবে।অপরিকল্পিত এসব সরকারি ভবন নির্মাণের ফলে বনানী থেকে উত্তরা পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, ‘সড়কে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা দূর করার কথা যাদের তারাই এখন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। আমি এ ব্যাপারে সরকারের দৃৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শুধু ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কেই নয়, পুরো ঢাকাজুড়েই যানজট চরমে।

রাজধানীর বাংলামটর, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব মোড়, মতিঝিল, মহাখালী, জাহাঙ্গীর গেট, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মৎস্য ভবন, প্রেস ক্লাব, পল্টন মোড়, গুলিস্তান এলাকায় বেশি যানজট সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোতেও। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার কারণে এই এলাকা ঘিরে রাস্তাগুলোতে মানুষ ও যানবাহনের ভিড় বেশি ছিল।

ভৌগোলিকভাবে ঢাকা একটি অতিমহানগরী বা মেগাসিটি। ঢাকার দুই সিটিতে জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ঘনত্বে ঢাকা মহানগর ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে লোকসান আর ভোগান্তির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ঠিক কতটা অর্থনৈতিক লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, কতটা কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, মানুষ কতটা ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছে, এ নিয়ে চলছে নানা রকম গবেষণা।

যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতি মাসে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ঢাকার যানজটের কারণ হিসেবে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, প্রাইভেটকার দিয়ে সড়কের জায়গা দখল এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ৯৮ দশমিক ৩ ভাগ গণপরিবহন এবং ৬৮ ভাগ প্রাইভেটকার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে। রাজধানীতে যানজটের কারণে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে এক কোটি ৯০ লাখ কর্মঘণ্টা। যানজটে নষ্ট হওয়া অতিরিক্ত সময়ের মূল্য গড়ে ঘণ্টায় ৭০ টাকা ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ ১৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। রাজধানীর সড়কে পরিচালিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এআরআইয়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, একটি শহরের রাস্তার পরিমাণ হওয়া উচিত ২৫ শতাংশ। কিন্তু ঢাকায় মোট রাস্তার পরিমাণ মোট আয়তনের মাত্র ৮ শতাংশ। পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিলে ৮ ভাগ রাস্তা থাকা সত্ত্বেও ঢাকার যানজট নিরসন সম্ভব। ঢাকার চেয়ে কলকাতায় একসময় যানজট বেশি ছিল। সেই কলকাতার যানজট এখন ঢাকার তুলনায় তুচ্ছ। 

আয়তনের তুলনায় লন্ডন-সিঙ্গাপুরেও রাস্তা কম। অথচ এই দুই নগরীতে দুঃসহ যানজট নেই। হংকংয়ের ৯০ শতাংশ লোক পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে। ঢাকায় যানজটের প্রধান কারণ যথাযথ নগর পরিচালন ব্যবস্থা না থাকা।

যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, ঢাকার রাস্তাগুলোতে গাড়ির চাপ বেশি থাকায় জট তৈরি হচ্ছে। কোথাও রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় এ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো যানবাহন চালকরাও ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা না মানায় অবস্থা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।