Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ধীরগতি

মহিউদ্দিন রাব্বানি

মহিউদ্দিন রাব্বানি

মে ২২, ২০২২, ০২:২১ এএম


ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ধীরগতি
  • পাঁচ বছরের প্রকল্পে অর্ধেক সময়ে ২০ ভাগের ১ ভাগ কাজ সম্পন্ন
  • নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ করতে হলে কাজ করতে হবে দ্বিগুণ
  • লোকবল ও পরিবহন না থাকায় প্রশিক্ষণের মান ঠিক থাকছে না : টিটিসি
  • করোনার কারণে প্রকল্পের কাজে বিলম্ব 
  • দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করছি : অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বিএমইটি

একটি দেশের ভিত দাঁড়িয়ে থাকে দক্ষ জনশক্তির ওপর। আর দক্ষ জনশক্তিই দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে দক্ষ জনশক্তির অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের প্রধান রপ্তানিমুখী তৈরি শিল্প পোশাক খাতে হাজার হাজার বিদেশি শ্রমিক উচ্চ বেতনে কাজ করছেন। এভাবে দেশ থেকে প্রতি বছর শত শত কোটি ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। 

এছাড়া আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে শতকরা ৯০ জনই অদক্ষ শ্রমিক। এদের নেই কারিগরি কোনো জ্ঞান। শ্রশিক্ষণের অভাবে তারা যথাযথ কাজ পাচ্ছে না। আবার কাজ পেলেও স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা কম আয় হয়।

সরকার দেশে দক্ষ লোকবল তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মুজিববর্ষে একটি স্লোগান নির্ধারণ করা হয়— মুজিববর্ষের আহ্বান, দক্ষ হয়ে বিদেশ যান। এদের শ্রমের মজুরি অন্যান্য দেশের দক্ষ জনশক্তির চেয়ে অনেক কম। এরই প্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো দেশে কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের অধীনে এক লাখ দুই হাজার চারশ দক্ষ চালক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। 

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএমইটি) দেয়া তথ্য মতে, দেশের ৬৪ জেলায় এক যোগে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু করোনা মহামারির কবলে পুরো দেশ স্থবির হয়ে পড়ে। এজন্য তারা কাজ শুরু করতে পারেনি বলে জানান জনশক্তি কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরো। 

যদিও প্রকল্প শুরুর আড়াই মাস পর করোনা শুরু হয় দেশে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি দেশে স্বাস্থ্যবিধি উঠিয়ে দিলেও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো কাজ শুরু করে ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও  কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না সংস্থাটির। এরই মধ্যে করোনায় সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। 

পরবর্তীতে ২০২০ সালের নভেম্বরে লোকবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তখন ৪০ হাজার টাকা বেতনে ১৯২ জন ড্রাইভার এই প্রকল্পের জন্য  নিয়োগ দেয়া হয়। এতে ১২৮ জন ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর (ব্যবহারিক) ও ৬৪ জন ড্রাইাভং ইন্সট্রাক্টর (তাত্ত্বিক) নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে একই বেতনে আরও ১৪২ জন ড্রাইভার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এতে ১০৬ জন  ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর (ব্যবহারিক) ও ৩৬ জন ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর (তাত্ত্বিক) নিয়োগ দেয়া হয়। দুই দফায় মোট ৩৩৪ জন ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ দেয়া হয়। এই প্রকল্পে শুধু ড্রাইভিং খাতে ৮০ কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয় ২৬৭ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। 

এই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। প্রশিক্ষণ শতভাগ ফ্রি। উল্টো প্রশিক্ষণ নিতে এলে দৈনিক ১০০ টাকা করে দেয়া হবে। কোর্স শেষে প্রতি শিক্ষার্থী পাবে আট হাজার আটশ টাকা। দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান প্রকল্পের আওতায় চলমান ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য দেশের ৬৪ জেলায় এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে। এ সময়ের মধ্যে ৬১টি জেলা থেকে পর্যায়ক্রমে দক্ষ চালক সৌদি আরবে পাঠাবে সরকার। 

প্রকল্পের বিষয়ে জানা যায়, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ৪০ জনকে নির্বাচিত করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) থেকে কোনো ধরনের পরীক্ষা দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। সরাসরি সৌদি আরবের কোম্পানি পরীক্ষা নেবে।

একটি সূত্র জানায়, সৌদি আরবে এক লাখ দক্ষ চালকের কর্মসংস্থানের সুযোগ লুফে নিতে সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস সরকারকে জানায়। এসব চালকের পরীক্ষা ও লাইসেন্স দেয়ার জন্য সৌদি আরবের দাল্লাহ আল বাকারা কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই কোম্পানি বাংলাদেশি চালকদের প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষা নেবে এবং লাইসেন্স দেবে। সৌদি আরবে এই কোম্পানি ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এই লাইসেন্স প্রাপ্তিতে এসব চালক পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী তেলসমৃদ্ধ জিসিসিভুক্ত (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশে ড্রাইভিং পেশায় কাজ করতে পারবেন।

জিসিসিভুক্ত দেশগুলো হলো— কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েত। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) মীর খায়রুল আলম আমার সংবাদকে বলেন, দেশে ও বিদেশে আমাদের আরও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প দক্ষ মানব তৈরিতে কাজ করছে । প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা দেশে বা বিদেশে ভালো দক্ষতার পরিচয় দেবে বলে আশা করি। 

দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান প্রকল্প পরিচালক শাহ আলম আমার সংবাদকে জানান, করোনার কারণে আমাদের প্রকল্পের কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা সারা দেশে প্রশিক্ষণ শুরু করেছি। গত বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ব্যাচ, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দ্বিতীয় ব্যাচ এবং এপ্রিল থেকে তৃতীয় ব্যাচ চলমান। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। প্রশিক্ষণের আওতায় একজনকে তিন মাসে ৩৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতিটি জেলায় দুটি প্রশিক্ষণ গাড়ির মাধ্যমে ২০ জন করে দুই শিফটে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা ছিল। 

কিন্তু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে খবর নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ প্রশিক্ষণকেন্দ্র একটি করে গাড়ি পেয়েছে। এছাড়া প্রতি শিফটে ২০ জনের পরিবর্তে ৪০ জন শিক্ষার্থী নেয়া হচ্ছে। এমনকি অধিকাংশ কেন্দ্রে ৮০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী নেয়া হচ্ছে। করোনার ঘাটতি পূরণে এমনটি করা হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে এ বিষয়ে কিছু বলতে নারাজ এক কর্মকর্তা।

৬১টি জেলায় ১২৮টি প্রশিক্ষণ গাড়ি ক্রয় করার কথা থাকলেও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গাড়ি পাচ্ছে না। প্রতি বছর এক একটি কেন্দ্রে চারটি ব্যাচ হবে। পাঁচ বছরে ৬১টি জেলায় মোট এক লাখ দুই হাজার ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এদের মধ্যে দক্ষরাই সৌদি আরবে যেতে পারবেন। কিন্তু কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রেইনার ও গাড়ি না থাকায় প্রশিক্ষণে ব্যত্যয় ঘটছে এমনটি জানান এক টিটিসির অধ্যক্ষ। 

এছাড়া বিভাগীয় শহরে একটি করে ট্রাক দেয়ার কথা ছিল। দেশের এক লাখ দুই হাজার ৪০০ গাড়ি চালককে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে বলে জানা যায়। এরপর তাদের সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরি দেয়া হবে। এক লাখ ড্রাইভার প্রশিক্ষণের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিদেশে যারা কাজ করতে যায় বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গাড়ি চালকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। 

সৌদি রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, এক লাখ ভালো মানের চালক পাওয়া গেলে আজকেই চাকরি দিতে পারবেন। এটি শুধু সৌদি আরবেই, অন্য দেশ তো আছেই। প্রশিক্ষণ শেষের সঙ্গে সঙ্গে তারা চাকরি পেয়ে যাবে। 

প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসা জামান হোসেন জানান, আমি শপিংমলে কাজ করতাম। বিএমইটির ওয়েবসাইটে এই প্রশিক্ষণের বিজ্ঞপ্তি দেখতে পেয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আসি। আমি সৌদি আরব যেতে চাই। এই জন্য দক্ষতা অর্জন করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে যেতে চাই যাতে করে আমি এবং আমার দেশ উপকৃত হয়।

প্রকল্প থেকে জানা যায়, এক লাখ দুই হাজার ৪০০ জনকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য ১২৮টি ডাবল কেবিন পিকআপ, আটটি ট্রাক ও একটি মাইক্রোবাস ক্রয়, প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতি, অফিস যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং প্রশিক্ষক ও জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। দেশে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সংগঠনের হিসাবে আমাদের দেশে ১২ থেকে ১৫ লাখ চালকের দরকার। কিন্তু প্রশিক্ষিত চালকের অভাবে তারা অদক্ষদের হাতে গাড়ি তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।