ক্রীড়া প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
ক্রিকেট বিশ্বের এক বিশাল বাজার ও আবেগপ্রবণ দর্শকগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ। অথচ আসন্ন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সেই বাংলাদেশের 'ন্যায়সংগত নিরাপত্তা উদ্বেগ'কে পাত্তাই দিল না আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ভারতের বৈরি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ভেন্যু পরিবর্তনের বিসিবির অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দিয়েছে আইসিসি। বাংলাদেশের জায়গায় তড়িঘড়ি করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে স্কটল্যান্ডকে। আইসিসির এমন একপেশে ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন পাকিস্তানের ব্যাটিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ ইউসুফ।
সোমবার রাতে নিজের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে দেওয়া এক পোস্টে আইসিসির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন এই সাবেক তারকা।
মোহাম্মদ ইউসুফ তাঁর পোস্টে নিছক আবেগ নয়, বরং কড়া গাণিতিক যুক্তি দিয়ে আইসিসিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, একটি নির্দিষ্ট ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের দর্শক সংখ্যা বা বাজারমূল্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
ইউসুফ লেখেন, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড, নেপাল, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তান—এই ১০টি দেশের সম্মিলিত ক্রিকেট দর্শক সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ। অথচ একা বাংলাদেশেরই দর্শক সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ।
অর্থাৎ, আইসিসি কেবল একটি দেশ নয়, বরং বিশ্বের অর্ধেক ক্রিকেট দর্শকদের আবেগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ইউসুফ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, যে খেলাটি পুরোপুরি দর্শকদের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এত বড় একটি জনপদকে অবজ্ঞা করা কি কোনো সুস্থ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে?
আইসিসির শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইউসুফ আরও লেখেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তাজনিত ন্যায়সংগত উদ্বেগকে উপেক্ষা করা আইসিসির ধারাবাহিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। যখন নিয়ম নয়, বরং বেছে বেছে কাউকে সুবিধা দেওয়া হয়, তখন ন্যায়বিচার হারিয়ে যায়। ক্রিকেটকে কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং নির্দিষ্ট নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি ভারতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছিল বিসিবি। কিন্তু ২১ জানুয়ারি বোর্ড সভার পর আইসিসি জানিয়ে দেয়, ভারতকে বাদ দিয়ে বা হাইব্রিড মডেলে বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত গত শনিবার বিসিবিকে জানানো হয়, বাংলাদেশ অংশ না নিলে স্কটল্যান্ড সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে।
এদিকে এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যু সমাধান না করে বা তাদের বাদ দিয়ে বিশ্বকাপ হলে পাকিস্তানও টুর্নামেন্ট বর্জন করতে পারে।
গতকাল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন মহসিন নাকভি। বৈঠকের পর তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তাঁকে আইসিসি-সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা সব পথ খোলা রেখে বিষয়টি সমাধান করি। পাকিস্তান দল বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী শুক্রবার বা সোমবারের মধ্যে জানানো হবে।
মোহাম্মদ ইউসুফ কেবল একজন সাবেক ক্রিকেটার নন, তিনি পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ। ৯০টি টেস্ট এবং ২৮৮টি ওয়ানডে খেলা এই কিংবদন্তি পাকিস্তানের টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ এবং ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। অবসরের পর জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের মুখ থেকে আইসিসির বিরুদ্ধে এমন কড়া সমালোচনা বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইসিসি যদি ভারতের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো একটি বড় ক্রিকেট শক্তিকে এভাবে একঘরে করে রাখে, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদী বিভাজন তৈরি করবে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডকে দিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে আইসিসি কার্যত ছোট দেশগুলোর মাধ্যমে বড় বাজারকে দমানোর চেষ্টা করছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
২০২৬ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস না করায় এবং পাকিস্তান তাদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় আইসিসি এখন বড় ধরনের সংকটে। মোহাম্মদ ইউসুফের তোলা 'ন্যায়পরায়ণতার' প্রশ্নটি এখন কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের মনের প্রশ্ন। আইসিসি কি শেষ পর্যন্ত তাদের একগুঁয়েমি বজায় রাখবে, নাকি ক্রিকেটীয় স্পিরিট রক্ষায় কোনো সমঝোতায় আসবে?
এএন