ডিসেম্বর ২৮, ২০২২, ০১:১৪ এএম
স্বপ্ন আজ বিশ্বাসে রূপ নিলো। লাল-সবুজের মেট্রোরেলে। স্বপ্নবাহন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। আজ রাজধানীর বুকে দরজা খুলছে দেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন উদ্বোধনের মাধ্যমে। হলো অদম্য স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। উন্নয়ন যাত্রায় বিশ্ব আজ বিস্ময়াভিভূত। পদ্মা সেতুর পর বাংলাদেশের মানুষের আরেকটি স্বপ্ন পূরণ হয়ে হলো।
সেই প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ উত্তরা ‘সি ওয়ান’ ব্লক খেলার মাঠ থেকে উদ্বোধন করবেন। সবুজ পতাকা দুলিয়ে মেট্রোরেলের যাত্রার সংকেত দেবেন তিনি। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী হিসেবে টিকিট কেটে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে চড়ে আগারগাঁও স্টেশনে নামবেন। উদ্বোধনের পরদিন, অর্থাৎ কাল থেকেই মেট্রোরেলে যাত্রী পরিবহন শুরু হবে। প্রথমদিকে দিয়াবাড়ি-আগারগাঁও রুটের ৯টি স্টেশনের মধ্যে তিনটিতে (দিয়াবাড়ি, পল্লবী ও আগারগাঁও) যাত্রী ওঠানামা করবে।
দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সসহ (এসএসএফ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাজানো-গোছানোর মধ্য দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে ট্রেন ও স্টেশন। টিকিটিং ব্যবস্থাও পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে। কাল বৃহস্পতিবার থেকে সাধারণ যাত্রীরাও উঠতে পারবেন মেট্রোরেলে। চলাচলে থাকবে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। নগরীর বুকে স্বপ্নের বাস্তবায়নে ঢাকায় আজ উৎসবের আমেজ বাইছে। বর্ষায় একটু পানি হলেই যে মিরপুরে চলাচল-যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেত; জরুরি কাজ করা, অফিস-আদালতে আসা কষ্ট হয়ে যেত, সেসব সমস্যার আজ ইতি ঘটতে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহামারির ধকল সামলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। আগে উন্নয়নের যে ধারাবাহিকতা ছিল, সে অবস্থায় ফিরে যাবে। আগের মতো আট শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে ২০২৩ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আগারগাঁও স্টেশনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক বলেন, উদ্বোধনের পর বৃহস্পতিবার থেকে প্রতি ১০ মিনিট অন্তর চলবে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল। উত্তরার উত্তর থেকে ও আগারগাঁও স্টেশনের মধ্যে প্রতি যাত্রায় ২০০ করে যাত্রী বহন করবে একেকটি ট্রেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বুধবার দিয়াবাড়ির উত্তরা উত্তর স্টেশনে মেট্রোরেলের উদ্বোধন করবেন। তারপর প্রথম যাত্রী হয়ে ট্রেনে চেপে পৌঁছাবেন আগারগাঁও স্টেশনে। আপাতত এ অংশটুকুতেই ট্রেন চলাচল শুরু হচ্ছে।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করছে জাপানের সহযোগিতায়। এর মধ্যে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত অংশের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার।
এমএএন ছিদ্দিক বলেন, যাত্রীরা যাতে মেট্রোরেলের সঙ্গে অভ্যস্ত হন, সেজন্য শুরুর দিকে ২০০ করে যাত্রী নিয়ে চলবে ট্রেন। স্টেশনে ১০ মিনিট থেমে যাত্রী ওঠানামার কাজ করা হবে। যাত্রীরা অভ্যস্ত হতে থাকলে ক্রমান্বয়ে মাঝপথের স্টেশনগুলো থেকেও যাত্রী ওঠানো শুরু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করছি মার্চের মধ্যে পরিপূর্ণ যাত্রী নিয়ে পুরোদমে চলবে মেট্রোরেল।
ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, আপাতত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে এই ট্রেন এবং প্রতি মঙ্গলবার বন্ধ থাকবে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সরাসরি চললে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত সময় লাগবে ১০ মিনিট ১০ সেকেন্ড। মেট্রোরেলের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ টাকা হারে; সে হিসেবে প্রথম চালু হতে যাওয়া অংশে চলতে গুনতে হবে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, শুরুর দিকে ছয় কোচবিশিষ্ট ১০টি ট্রেন চলাচল করবে উত্তরা-আগারগাঁও পথে। অতিরিক্ত হিসেবে আরও দুটি ট্রেন ডিপোতে প্রস্তুত রাখবেন তারা।
ট্রেনে যা যা থাকছে : স্টেশনে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকছে, শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তন করার ব্যবস্থাও রয়েছে। মেট্রোরেলের প্রতি ট্রেনে ছয়টি কোচ বা বগি থাকছে। দুই প্রান্তের দুটি কোচকে বলা হচ্ছে ‘ট্রেইলর কার’। এতে চালক থাকবেন। এসব কোচে ৪৮ জন করে যাত্রীও বসতে পারবেন। মাঝখানে চারটি কোচ হচ্ছে মোটরকার। এর প্রতিটিতে বসার ব্যবস্থা আছে ৫৪ জনের। সব মিলিয়ে একটি ট্রেনে বসে যেতে পারবেন ৩০৬ জন। প্রতিটি কোচ সাড়ে ৯ ফুট চওড়া। মাঝখানের প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন। দাঁড়ানো যাত্রীদের ধরার জন্য ওপরে হাতল এবং স্থানে স্থানে খুঁটি আছে। একটি ট্রেনে বসে ও দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩০৮ যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) এই ট্রেনের দুই পাশে সবুজ রঙের দুই সারি লম্বা আসন পাতা হয়েছে। প্রতিটি কোচের দুই পাশে চারটি করে আটটি দরজা আছে। অর্থাৎ, ট্রেন স্টেশনে থামলে চারটি দরজা একসঙ্গে খুলে যাবে। বাকি চারটি বন্ধ থাকবে। দুই প্রান্তের দুটি কোচে দুটি করে চারটি হুইলচেয়ার বসানোর ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। ট্রেনের নকশা প্রণয়ন ও তৈরির কাজ করছে জাপানের কাওয়াসাকি-মিৎসুবিশি কনসোর্টিয়াম।
ভ্রমণে থাকছে যেসব বিধিনিষেধ : মেট্রোরেলে চলাচলে ১৪টি বিধিনিষেধ মানতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে : ধূমপান করা যাবে না। পান খাওয়া যাবে না এবং যেখানে-সেখানে পানের পিক ফেলা যাবে না। নির্দিষ্ট স্থানে থুতু ও ময়লা ফেলতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ। স্টেশন বা ট্রেনে কোনো ধরনের পণ্য ফেরি করা যাবে না। আগ্নেয়াস্ত্র বা বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ। পোষা প্রাণী বহন করা যাবে না। পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াল লিখন চলবে না। ভারী ও বড় আকারের পণ্য পরিবহন করা যাবে না। একাধিক আসন দখল করে বসা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই ড্রাইভিং ক্যাবে প্রবেশ নয়। মাঝখানের চলাচলের পথে দাঁড়িয়ে অন্যদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। মহিলাদের কোচে পুরুষ যাত্রীদের ওঠা যাবে না। দেশের প্রথম মেট্রোরেলে নারীদের নির্বিঘ্ন চলাচলে প্রতিটি ট্রেনে থাকছে আলাদা কোচ।
