আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি আর ডলার সংকটের ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট, ঠিক তখনই সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট আয়তনের সুবিশাল সব ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৭৮৬ কোটি টাকার এই বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পে থাকছে ছাদের ওপর সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম এবং আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকায় এমন ‘প্রাসাদোপম’ ভবন নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজ।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা রমনা ও বেইলি রোডে বর্তমানে মন্ত্রীদের জন্য ১৫টি বাংলো এবং ৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। তবে সেই পুরনো ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে ‘ঢাকাস্থ রমনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য ৩টি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
ফ্ল্যাটের বিশালত্ব: নতুন ১১ তলা ভবনগুলোতে ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। সাধারণত উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তাবিত এই ফ্ল্যাটগুলো হবে তার প্রায় ৬ গুণ বড়। এমনকি সরকারি নিম্ন পদের কর্মচারীদের বাসার তুলনায় এটি ১৪ গুণ বড়।
ছাদবাগানে সুইমিংপুল: প্রতিটি ভবনের ছাদে থাকবে আধুনিক সুইমিংপুল। এর সরঞ্জাম কিনতেই বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৩ কোটি টাকা।
আসবাব ও সাজসজ্জা: কেবল আসবাবপত্র এবং পর্দা কিনতেই খরচ ধরা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।
কমিউনিটি স্পেস ও জিম: ভবনের ভেতরেই থাকছে নিজস্ব ব্যায়ামাগার এবং বড় অনুষ্ঠান করার মতো কমিউনিটি সেন্টার।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে ঢাকা শহরে মন্ত্রীদের বসবাসের জন্য ৭১টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্ধারিত আছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক বাংলো খালিও পড়ে আছে। এই পর্যাপ্ততা থাকার পরেও কেন নতুন বিশাল ফ্ল্যাট প্রয়োজন, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য অস্পষ্ট। তবে সূত্র বলছে, মন্ত্রীদের জন্য এই বিশাল ফ্ল্যাটগুলো নির্মিত হলে বর্তমানে তারা যে ৫ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটগুলোতে থাকছেন, সেগুলো আমলাদের জন্য বরাদ্দ পাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। অর্থাৎ, আমলাতন্ত্রের উচ্চাভিলাষও এই প্রকল্পের পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, এই ভবনগুলোতে মন্ত্রীদের পাশাপাশি সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানদের (যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন বা নির্বাচন কমিশনের সদস্য) বসবাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক সংস্থার ব্যক্তিদের নির্বাহী বিভাগের মন্ত্রীদের সঙ্গে একই ভবনে থাকা অনৈতিক। এতে করে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার এবং রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'একই কমপ্লেক্সে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ব্যক্তিদের বসবাস স্বার্থের দ্বন্দমুক্ত সুশাসন নিশ্চিতের পথে অন্তরায়। যারা নিরপেক্ষ থাকতে চান, তাদের জন্য এটি বিব্রতকর; আর যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য এটি বিশেষ সুযোগ।'
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পকে দেখছেন ‘ভাঙ্গা ঘাড়ে বোঝার উপর শাকের আঁটি’ হিসেবে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজস্ব আদায়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি রয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কারে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, তখন ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানানো কোনোভাবেই সংগত নয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে যেখানে একটি জনবান্ধব ও মিতব্যয়ী রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল, সেখানে মন্ত্রীদের জন্য এই বিশাল আবাসন প্রকল্প বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। ৪ কোটি মানুষ যখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তখন নীতিনির্ধারকদের এই বিলাসিতা কি কেবলই একটি আবাসন প্রকল্প, নাকি জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোতে থাকা এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এএন