নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১২:৩০ এএম
বর্তমান সময়ে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার-প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের কারসাজি আর কৃত্রিম সংকটে নাভিশ্বাস উঠছে ভোক্তাদের।
বিশেষ করে সয়াবিন তেলের বাজারে আমদানিকারকদের জিম্মি দশা এবং সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর অপকৌশল সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে তপ্ত করে তুলেছে। এক লিটার তেল কিংবা এক কেজি সবজি কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে আজ হিমশিম খেতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। শীতকালীন সবজির বিদায় আর গ্রীষ্মকালীন সবজির আগমনের এই সন্ধিক্ষণে অধিকাংশ সবজির দাম এখন শতকের ঘর ছাড়িয়েছে। চাল, ডাল, চিনি ও মুরগির মাংসের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা অনেক ভারী হয়ে গেছে।
বাজার মনিটরিং ও র্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মজুত পণ্য জব্দ হলেও মাঠ পর্যায়ে এর সুফল খুব একটা মিলছে না। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন না এলে সাধারণ ভোক্তার এই দীর্ঘশ্বাস অচিরেই গণঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া, তালতলা ও কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম এখন সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে।
সবজির বাজারে ‘সেঞ্চুরি’র ছড়াছড়ি : গ্রীষ্মকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও স্বস্তি ফেরেনি সাধারণ ক্রেতাদের মনে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে ৫ কেজির এক পাল্লা সবজি ৪০০ টাকার নিচে কেনা যাচ্ছে না। ফলে খুচরা পর্যায়ে লাভ করতে গেলে ১০০ টাকার নিচে বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের সবজির দরদাম এক নজরে : ১০০-১২০ টাকা কেজি: বরবটি, কচুর লতি, করলা, পটল, কচুরমুখী, সাজনা ও ক্যাপসিকাম।
মুরগির বাজারে ৪০ টাকার লাফ : আমিষের বাজারেও বিরাজ করছে অস্থিরতা। ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে গরু ও খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
মাছের বাজারে ইলিশের ‘আভিজাত্য’ : মাছের বাজারে গিয়ে রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ সাধারণ ক্রেতাদের। ইলিশের দাম এখন আকাশচুম্বী। মাত্র ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশের কেজিও ১৪০০-১৫০০ টাকা। মাঝারি সাইজের (৫০০ গ্রাম) ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২০০০-২২০০ টাকায়। রুই মাছের কেজি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং দেশি শিং বা মাগুর মাছ ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
পেঁয়াজ ও আলুর চিত্র : পেঁয়াজের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৪০ টাকায় ঠেকেছে।তবে এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে একমাত্র স্বস্তির খবর দিচ্ছে আলু। বাজারে বর্তমানে আলুর কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা, যা গত সপ্তাহের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে।
ডিমের বাজারে বৈষম্য : বাজারে লাল ডিমের ডজন ১১০-১২০ টাকা হলেও হাঁসের ডিমের দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে এক ডজন হাঁসের ডিম কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২০০ টাকা।
ক্রেতাদের ক্ষোভ ও প্রশাসনের দৃষ্টি : বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে একশ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তালতলা বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন, ‘বেতন তো বাড়ে না, কিন্তু প্রতি সপ্তাহে বাজারের খরচ ৫০০ টাকা করে বাড়ছে। আয় আর ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছি না। তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষ না খেয়ে মরবে।’ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বাজার মনিটরিংয়ের কথা বললেও বাস্তবে তার খুব একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
সর্বোপরি, সামগ্রিকভাবে, নিত্যপণ্যের বাজারের এই লাগামহীন উর্ধ্বগতি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যেরই প্রতিফলন। যখন সাধারণ মানুষের আয় স্থবির, তখন চাল-ডাল-তেলসহ মৌলিক চাহিদার আকাশচুম্বী দাম মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নামমাত্র জরিমানা বা সাময়িক অভিযান এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়; বরং উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের কঠোর বাজার মনিটরিং, সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ ভোক্তাদের এই নাভিশ্বাস থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব। অন্যথায়, নিত্যপণ্যের এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনমানকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলবে।