নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর সরকারি ঘোষণার পর বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কমেনি। লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়তি দাম গুনেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালক ও সাধারণ ভোক্তাদের। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অজুহাত, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট জনজীবন।
পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ সারি, এক অমীমাংসিত দুর্ভোগ : রাজধানীর প্রগতি সরণি, তেজগাঁও এবং কল্যাণপুর এলাকার বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে যন্ত্রণার এক অভিন্ন চিত্র। মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ট্রাক- সব যানবাহনের দীর্ঘ লাইন ছড়িয়ে পড়েছে প্রধান সড়কগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী এক বাস চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে তেলের দাম কম ছিল, কষ্টও কম ছিল।
এখন দামও বাড়ল, আবার লাইনে দাঁড়িয়ে সময়ও নষ্ট হচ্ছে। দিনে ৫-৬ ঘণ্টা যদি পাম্পেই চলে যায়, তবে আমরা আয় করব কখন? পরিবার চালাব কীভাবে?’ অনেকেই অভিযোগ করছেন, পাম্প মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। তবে পাম্প মালিকদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা- কোথায় ফারাক : জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং মজুত পর্যাপ্ত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সম্প্রতি সরবরাহ বাড়ানোর যে রূপরেখা দিয়েছে তা নিম্নরূপ—
জ্বালানির ধরন- বর্তমান সরবরাহ (বর্ধিত) বৃদ্ধির হার ডিজেল ১১,০০০ মেট্রিক টন ১৩,০০০ মেট্রিক টন ১০%-২০% পেট্রোল ১,২০০ মেট্রিক টন ১,৫০০+ মেট্রিক টন ২৫% অকটেন ১,১৮৫ মেট্রিক টন ১,৪২২ মেট্রিক টন ২০%। এত বিপুল পরিমাণ সরবরাহ বাড়ানোর পরও কেন সংকটের চিত্র বদলাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাম্প মালিকদের অভিযোগ- ভুল সিদ্ধান্ত ও চাহিদার ভুল মূল্যায়ন : বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক সরাসরি নীতি-নির্ধারকদের দিকে আঙুল তুলেছেন। তার মতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। বিপিসি গত বছরের বিক্রির ওপর ভিত্তি করে সরবরাহ দিচ্ছে, যা বর্তমান বর্ধিত চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
তার মতে, সংকটের প্রধান কারণগুলো হলো- চাহিদার সঠিক ম্যাপিং না থাকা: কতগুলো নতুন যানবাহন রাস্তায় নেমেছে তার কোনো সঠিক হিসাব জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ডিপোর সক্ষমতা: অনেক সময় ঘোষণা দিলেও ডিপো থেকে সময়মতো তেল সরবরাহকারী লরিগুলো পাম্পে পৌঁছাতে পারছে না। অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা: ফিলিং স্টেশনগুলোর ধারণক্ষমতা এবং রিফিলিংয়ের সময়সীমা নিয়ে সমন্বয়ের অভাব।
সরকারের বক্তব্য- ‘ধৈর্য ধরুন, স্বস্তি ফিরবে’ : জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী আশ্বস্ত করে বলেছেন, সরবরাহ বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে কয়েক দিন সময় লাগে। তিনি জানান, ‘আমরা শুধু সরবরাহ বাড়াইনি, ফিলিং স্টেশনগুলোর অপারেশনাল সক্ষমতা বা তারা ঠিকমতো তেল দিচ্ছে কি না সেদিকেও নজর রাখছি। আশা করছি আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে লাইনের দৈর্ঘ্য কমে আসবে।’ তবে সাধারণ মানুষ এই ‘কয়েক দিনের’ আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ দাম বাড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই।
আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূ-রাজনীতির প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির। যদিও বিপিসি দাবি করছে তাদের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, কিন্তু আমদানির ক্ষেত্রে ডলার সংকটের পাশাপাশি পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এক ধরনের অদৃশ্য চাপ অনুভূত হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো একটি পর্যায়ে বড় ধরনের লজিস্টিক জট সৃষ্টি হয়েছে যা নিরসন করা জরুরি।
সমাধানের পথ কী : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ঘোষণা দিয়ে সরবরাহ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি ফেরাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়া জরুরি
রিয়েল-টাইম মনিটরিং: প্রতিটি ডিপো থেকে কোন পাম্পে কতটুকু তেল যাচ্ছে তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং। ফুয়েল পাস সিস্টেমের প্রয়োগ: ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে ইতোমধ্যে ‘ফুয়েল পাস’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পিক-আওয়ার ম্যানেজমেন্ট: দিনের যে সময়ে ভিড় বেশি থাকে, সে সময়ে পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা।
সর্বোপরি, জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো। এই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা মানেই পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। সরকার এবং পাম্প মালিকদের মধ্যে এই ‘ব্লেম গেম’ বা একে অপরকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বন্ধ করে দ্রুত কার্যকর সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ গণঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে।