ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

কিট স্বল্পতায় হামের ভয়াল রূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ৭, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

কিট স্বল্পতায় হামের ভয়াল রূপ

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, অথচ এই মরণঘাতী রোগ শনাক্তের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ল্যাবে দেখা দিয়েছে তীব্র কিট সংকট। রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ল্যাবরেটরিতে বর্তমানে সাত হাজারেরও বেশি নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় পড়ে আছে, যা মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ নতুন নমুনা জমা হলেও কিট স্বল্পতায় পরীক্ষার গতি স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে দেশে ২৬৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪২ হাজার। বিশেষজ্ঞেরা আশঙ্কা করছেন, কিট সংকটের কারণে সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়ায় আক্রান্ত শিশুরা পরিবারের অন্যদের মধ্যে অজান্তেই সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে কিট আসার আশ্বাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে যে পরিমাণ মজুত আছে, তা দিয়ে এই বিশাল জট সামাল দেওয়া দুঃসাধ্য। ল্যাবে পরীক্ষার এই ধীরগতি ও কিট স্বল্পতা হামের সংক্রমণকে আরও ভয়াল করে তুলছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ল্যাবরেটরির বর্তমান চিত্র— সংকটে শনাক্তকরণ : জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে হাম শনাক্তের একমাত্র নির্ভরযোগ্য এই পরীক্ষাগারে কিটের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে পরিমাণ নমুনা প্রতিদিন জমা হচ্ছে, সেই তুলনায় বর্তমানে হাতে থাকা কিট দিয়ে মাত্র কয়েকদিন পরীক্ষা চালানো সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. মমিনুর রহমান পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘একেবারে সংকট না বললেও নমুনার তুলনায় কিটের কিছুটা স্বল্পতা অবশ্যই আছে। বর্তমানে আমাদের কাছে ১৩টি কিট রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১২০০ নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিদিন গড়ে ৩০০টির মতো নতুন নমুনা ল্যাবে আসছে। ফলে আমাদের এখানে বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি নমুনা জট লেগে আছে।’

আশার আলো: আসছে নতুন কিট : কিট সংকট নিরসনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ডা. মমিনুর রহমান জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসেই চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল। আশা করা যাচ্ছে আগামী দুই-একদিনের মধ্যে ৩০টি এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যে আরও ১০০টি কিট পৌঁছাবে। এই কিটগুলো হাতে পেলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যমান জট ও স্বল্পতা কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মৃত্যু ও আক্রান্তের ভয়াবহ পরিসংখ্যান : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার চিত্র: সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত দেশে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজন সরাসরি হামে এবং চারজন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ঢাকার বাইরে খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটের শিশুরা রয়েছে।

মোট মৃত্যু: গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে মোট ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ৫৪ জন। আক্রান্তের সংখ্যা: এ বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: কেন বাড়ছে সংক্রমণ : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেয়া এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা এই রোগের প্রধান কারণ। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং শহরের বস্তি অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে। ল্যাবে পরীক্ষার ধীরগতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগী শনাক্ত হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে অথবা রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

হাম মোকাবিলায় জরুরি করণীয়— দ্রুত কিট সংগ্রহ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে অতি দ্রুত বিদেশ থেকে কিট আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প ল্যাবরেটরি: শুধু একটি ল্যাবের ওপর নির্ভর না করে বিভাগীয় পর্যায়ে হাম পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। টিকাদান জোরদার: যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে হবে। জনসচেতনতা: জ্বর ও শরীরে লালচে দানা দেখা দিলেই শিশুকে আইসোলেশনে রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সর্বোপরি, হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে ২৬৩ জন শিশুর মৃত্যু জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় একটি সতর্কতা সংকেত। কিট সংকট কাটিয়ে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা অজানাই থেকে যাবে, যা মহামারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

দেশে হাম পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে শনাক্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮১ জনে। আর গত ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ২৬০ জন।

একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আর গত প্রায় দেড় মাসে মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৯ জনে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হার সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্রুত বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি ও সুস্থতার পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে চাপের চিত্র। ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৮৮৫ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৭ হাজার ২২৩ জন। তবে এখনো বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে। অন্যদিকে, একই ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৮ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি হলেও প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং দেরিতে চিকিৎসা নেয়ার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Link copied!