ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সিন্ডিকেটে ব্যাহত মেট্রোরেল সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১৭, ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

সিন্ডিকেটে ব্যাহত মেট্রোরেল সেবা

রাজধানী ঢাকার যানজটজড়িত ব্যস্ত জীবনে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় স্বস্তির নাম হয়ে উঠেছে ‘মেট্রোরেল’ (এমআরটি লাইন-৬)। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কোচ, স্বয়ংক্রিয় টিকিট ব্যবস্থা এবং ঘড়ির কাঁটা ধরে যাতায়াতের সুবিধা নগরবাসীকে এক নতুন যাতায়াত সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

উত্তরা থেকে মতিঝিল কিংবা কমলাপুর- ঘণ্টার পর ঘণ্টার যানজট ঠেলে যেখানে যেতে আগে অর্ধেক দিন পার হয়ে যেত, এখন সেখানে পৌঁছানো যাচ্ছে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব স্বস্তির উল্টো পিঠেই জমাট বাঁধছে তীব্র ক্ষোভ আর অস্বস্তি।

মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর ভেতরে আন্তর্জাতিক মানের পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও, স্টেশনের ঠিক নিচের অংশ বা ফুটপাতগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্টেশনের ওপরের আধুনিকতার সাথে নিচের এই চরম অব্যবস্থাপনার তুলনা করে যাত্রীরা ক্ষোভের সাথে বলছেন মেট্রো স্টেশন যেন এখন ‘উপরে ফিটফাট, নিচে সদরঘাট’।

বিভিন্ন গবেষণা ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যানজটের কারণে গড়ে প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা। এই স্থবিরতা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতেই মেট্রোরেল প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। ১৬টি স্টেশনের ওপরের অংশ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সেখানে এক ফোঁটা ময়লা বা বিশৃঙ্খলা দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু ওপরের এই নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ পার হয়ে যাত্রী যখনই স্টেশনের নিচে বা ফুটপাতে পা রাখছেন, তখনই তাকে পড়তে হচ্ছে এক নরকযন্ত্রণা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে।

মিরপুর ১০, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ফার্মগেট এবং মতিঝিল- এই ব্যস্ততম স্টেশনগুলোর নিচে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় তীব্র অব্যবস্থাপনার চিত্র। ফুটপাত ও সিঁড়ি দখল: স্টেশনে ওঠানামার প্রধান সিঁড়ি বা এস্কেলেটরের ঠিক গোড়াতেই বসেছে জামাকাপড়, জুতো, ফলমূল ও চাটনি-ফুচকার শত শত অস্থায়ী দোকান।

অফিস সময়ে তীব্র ভোগান্তি: সকাল ও সন্ধ্যায় যখন হাজার হাজার যাত্রী একসাথে স্টেশন থেকে নামেন বা ওঠেন, তখন হকারদের এই দখলদারিত্বের কারণে সিঁড়ির মুখে কৃত্রিম জটলার সৃষ্টি হয়। নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ধাক্কাধাক্কি করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বর্জ্যের স্তূপ: হকারদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, ফলের খোসা ও কাগজের ঠোঙায় স্টেশনের নিচের পিলারগুলোর চারপাশ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই ময়লা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা আধুনিক একটি গণপরিবহন ব্যবস্থার সাথে চরম বেমানান।

ফার্মগেট স্টেশনে নামা এক নিয়মিত অফিসগামী যাত্রী শাহীন আলম বলেন, ‘স্টেশনের ভেতরে ঢুকলে মনে হয় ইউরোপ-আমেরিকায় আছি। আর নিচে নামলেই মনে হয় কোনো লঞ্চঘাট বা কাঁচাবাজারে চলে এসেছি। হকারদের কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই। ১০ সেকেন্ডে স্টেশন থেকে বের হয়ে ফুটপাতে এসে ১০ মিনিট জ্যামে আটকে থাকতে হয়।’

আরেক নারী যাত্রী সুলতানা পারভীন অভিযোগ করে বলেন, ‘সন্ধ্যাবেলা হকারদের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পকেটমার ও ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনাও ঘটছে। আমরা চাই ওপরের মতো নিচের পরিবেশও যেন সম্পূর্ণ সিসিটিভি এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা হোক।’

ফুটপাত ও স্টেশনের নিচে বসা হকারদের সাথে কথা বললে উঠে আসে তাদের জীবিকার সংকটের কথা। মিরপুর ১০ নম্বর স্টেশনের নিচে গেঞ্জি বিক্রেতা রহমত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা তো শখ করে ধুলোবালির মধ্যে বসি না।

পেটের দায়ে, জীবিকার তাগিদে এখানে বসতে হয়। আমাদের যদি পুনর্বাসন করা হতো বা কোনো বিকল্প জায়গা দেয়া হতো, আমরা অবশ্যই চলে যেতাম। সরকার ব্যবস্থা না করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’ হকারদের দাবি, তারা উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের একটি স্থায়ী সমাধান চান, যাতে তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ না হয়।

স্টেশনের নিচের এই চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্যামেরার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হয়নি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) বা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টেলিফোনে জানান, ‘মেট্রোরেল স্টেশনের ভেতরের অংশ এবং বাউন্ডারির ভেতরের জায়গার দেখভাল আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু স্টেশনের নিচের ফুটপাত ও রাস্তা দেখভালের আইনি দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এ বিষয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সরাসরি উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।’

অন্যদিকে সিটি করপোরেশন মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তাদের ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই ফুটপাত আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। যোগাযোগ ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমন্বয়হীনতা ও নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়ে স্টেশনের নিচে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, যারা নিয়ম বাস্তবায়ন করবেন, তারা যখন সঠিক নজরদারি করেন না, তখন সেখানে একটি অবৈধ সিন্ডিকেট তৈরি হয়। ফলে উচ্ছেদের নামে কেবল ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলতে থাকে। মেট্রোরেলের মতো একটি মেগা প্রকল্পের বাইরের পরিবেশ যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে হকার ও যানজটের কারণে বিরক্ত হয়ে একসময় অনেক মধ্যবিত্ত যাত্রী মেট্রোরেল এড়িয়ে চলতে পারেন। ফুটপাত সচল না থাকলে পুরো যাতায়াত ব্যবস্থার চেইনটাই ভেঙে পড়বে, যা ভবিষ্যতে মেট্রোরেলকে লোকসানের মুখেও ফেলতে পারে।’

মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন নয়, এটি আধুনিক ঢাকার একটি প্রতীক। ওপরের চাকচিক্য বজায় রেখে নিচের অংশকে হকার ও ময়লার স্বর্গরাজ্য বানিয়ে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

মেট্রো কর্তৃপক্ষ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে (ডিএমপি) যৌথভাবে কাজ করতে হবে। স্টেশনের চারপাশকে ‘স্মার্ট জোন’ বা ‘হকারমুক্ত জোন’ ঘোষণা করে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট হলিডে মার্কেট বা বিকল্প পুনর্বাসনের কথা ভাবা জরুরি। তবেই মেট্রোরেলের সুফল পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারবেন রাজধানীবাসী।

Link copied!