ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

স্বস্তির আড়ালে খরচের নতুন ফাঁদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ২০, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

স্বস্তির আড়ালে খরচের নতুন ফাঁদ

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও রাজধানীর বুক চিরে থাকা ফিলিং স্টেশনগুলোয় যে দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের, তা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, পিকআপভ্যান কিংবা বাসের কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা আর চালকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের সেই চেনা চিত্রটি এখন আর নেই। পাম্পগুলোয় ফিরে এসেছে শান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশ। তবে এই স্বস্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন অর্থনৈতিক সমীকরণ।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে রেকর্ড পরিমাণে বাড়ানোর পরই মূলত পাম্পগুলোর এই উপচে পড়া ভিড় উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে তেলের এই ‘সংকট উধাও’ হওয়ার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধিই নয় বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভূ-অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং বিপিসির সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক জটিল কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও ও যাত্রাবাড়ীর বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও তেল নেয়ার জন্য বাড়তি কোনো চাপ নেই। চালকেরা পাম্পে এসে কোনো দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়ে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই তেল নিয়ে নিজ গন্তব্যে ছুটে চলছেন।

মিরপুর ২ নম্বরের ‘স্যাম অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড’ পাম্পের ক্যাশিয়ার শরিফ আহমেদ পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এখন আমরা চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে যথেষ্ট পরিমাণ তেল পাচ্ছি। অথচ মাসখানেক আগে জোগান ও চাহিদার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। আগে যেখানে আমাদের সারা দিনে স্বাভাবিক চাহিদা ছিল ১০ হাজার লিটার, সংকট শুরু হওয়ার পর মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় চাহিদা ২০ হাজার লিটারে ঠেকেছিল। ওই অতিরিক্ত ১০ হাজার লিটার আমরা ডিপো থেকেও পেতাম না। ফলে মোটরসাইকেলের লম্বা সিরিয়াল সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হতো।’

একই পাম্পের মিটারম্যান রিফাত জানান, তেলের দাম যখন কম ছিল, তখন গ্রাহকেরা আতঙ্কে ‘ফুল ট্যাংকি’ তেল নিয়ে মজুত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দাম বাড়ার পর এখন যার দিনে যতটুকু প্রয়োজন, সে ঠিক ততটুকুই নিচ্ছে। ফলে পাম্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমাতে গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। নতুন নির্ধারিত মূল্যের তালিকা দেয়া হলো:

জ্বালানি তেলের নাম পূর্ববর্তী মূল্য (আনুমানিক) বর্তমান পুনর্নির্ধারিত মূল্য (প্রতি লিটার) পূর্বের মূল্য অকটেন ১২০-১২৫ টাকা, বর্তমান মূল্য ১৪০ টাকা, পেট্রোল পূর্বের মূল্য ১১৫-১২০ টাকা, বর্তমান মূল্য ১৩৫ টাকা, ডিজেল ৯৫-১০০ টাকা, বর্তমান মূল্য ১১৫ টাকা, কেরোসিন পূর্বের মূল্য ৯৫-১০০ টাকা, বর্তমান মূল্য ১১৫ টাকা।

বিপিসি জানিয়েছে, এই মূল্য সমন্বয়ের পর একদিকে যেমন ক্রেতাদের কৃত্রিম মজুতের প্রবণতা কমেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন করে তেল আমদানির পথ সুগম হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই কীভাবে বাজার থেকে সংকট উধাও হয়ে গেল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই একে ‘সিন্ডিকেটের কারসাজি’ বলে মনে করছেন। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এই সংকটের নেপথ্য কারণগুলো বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন।

তার মতে, মূল কারণগুলো হলো: আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধাবস্থার শিথিলতা: মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা এপ্রিলের শেষের দিকে এসে কিছুটা শিথিল হয়। যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে আসায় বাংলাদেশ নতুন করে আমদানির সুযোগ পায়, যা সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটায়।

ডলার সংকট ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ: ড. শামসুল আলম জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ বা ১২০ ডলারের ওপরে চলে যায়, তখন সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার তখন বাধ্য হয়ে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং সরবরাহ সীমিত করে দেয়।

ড. শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার যখন চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানি করতে পারে না, তখন বাধ্য হয়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এর ওপর যুক্ত হয় কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট। ফলে আমরা এক ধরনের ক্রসফায়ার পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। এখন ডলারের চাপ কিছুটা সামাল দিয়ে আমদানি স্বাভাবিক করায় সরবরাহ বেড়েছে।’ বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো অনেকটাই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। যদি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ শুরু হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশকে আবারও ৩টি প্রধান সংকটের মুখোমুখি হতে হবে: ডলার সংকট: আমদানির জন্য অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করতে হবে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে সরকারের ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়বে এবং সরবরাহ সংকট দেশের বাজারে আবারও রেশনিং এবং পাম্পে লাইনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

সর্বোপরি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে পাম্পের লাইন কমানো কিংবা সাময়িকভাবে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়তো একটি তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সমাধান, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী বা টেকসই নীতি হতে পারে না। তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ার ফলে পরিবহন খাতের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সদাইয়ের ওপর। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

Link copied!