ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

স্ক্রিনের আড়ালে ধ্বংসের ফাঁদ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুন ২৫, ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম

স্ক্রিনের আড়ালে ধ্বংসের ফাঁদ

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে স্মার্টফোনের একটি সাধারণ স্ক্রিন যেমন আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ও সর্বনাশা জগত। প্রযুক্তির অবারিত স্বাধীনতার অপব্যবহার করে সুকৌশলে পাতা হয়েছে এক ‘ডিজিটাল ফাঁদ’।

প্রথম দেখায় যা বিনোদন, নিছক কৌতূহল কিংবা দ্রুত সচ্ছলতা পাওয়ার সহজ মাধ্যম মনে হয়, তার আড়ালেই মূলত আটকে যাচ্ছে দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক বিজ্ঞাপনের এই ত্রিমুখী ছোবল এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে তা পৌঁছে গেছে প্রতিটি মানুষের শোবার ঘর পর্যন্ত। এই ধ্বংসের ফাঁদটি অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক। শুরুতে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ও গেমসের আড়ালে ‘ফ্রি বোনাস’ বা আকর্ষণীয় অফারের টোপ দিয়ে কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়।

একবার এই চক্রে পা দেয়ার পর, তারা নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ে ক্যাসিনো ও বেটিংয়ের মতো ভয়ংকর নেশায়। এর ফলে একদিকে যেমন পারিবারিক সঞ্চয় হারিয়ে লাখ লাখ তরুণ আর্থিকভাবে পঙ্গু হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে চরম মানসিক অবসাদ, ডিপ্রেশন ও অপরাধপ্রবণতা।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অদৃশ্য মহামারি, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। স্ক্রিনের এই প্রলোভন মূলত একটি রঙিন মরীচিকা, যা তরুণদের আলো থেকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এখনই যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে এই ডিজিটাল ফাঁদ আমাদের পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করবে।

একসময় জুয়া বা বাজি ধরা ছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরের একটি অনৈতিক কার্যক্রম, যা নির্দিষ্ট কিছু গোপন আস্তানায় বা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব এই অন্ধকার জগৎকে মানুষের শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। এখন আর কাউকে ক্যাসিনোতে যেতে হয় না; মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মাত্র কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই যে কোনো ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারছে অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ গেমিং অ্যাপের সর্বনাশা জগতে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, অনেক সময় সাধারণ ও নিরীহ গেমের আড়ালেও অত্যন্ত চতুরতার সাথে জুয়ার উপাদান যুক্ত করে দেয়া থাকে। এর ফলে কোমলমতি ব্যবহারকারীরা বা কিশোররা নিজেদের অজান্তেই এই মরণব্যাধিতে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জনপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্টকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে বিশাল ও সুসংগঠিত বেটিং নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ম্যাচের প্রতিটি বল, প্রতিটি ওভার, এমনকি খেলার প্রতিটি মুহূর্তকে কেন্দ্র করে লাইভ বাজি ধরার সুযোগ থাকে, যা তরুণদের সার্বক্ষণিক উত্তেজনার মধ্যে রাখে এবং নেশাগ্রস্ত করে তোলে।

এই অবৈধ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে। তারা শুরুতে ‘ফ্রি বোনাস’, ‘ট্রায়াল ব্যালেন্স’ কিংবা ‘ইনস্ট্যান্ট রিওয়ার্ড’-এর মতো লোভনীয় অফার বা প্রলোভন দেখায়। আর্থিক টানাপোড়েনে থাকা বা দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর কিশোর ও তরুণরা শুরুতে কোনো খরচ ছাড়াই এসব অ্যাপে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এই ‘ফ্রি’ মূলত একটি টোপ।

একবার এই চক্রে ঢুকে পড়ার পর যখন তারা সামান্য লাভ বা ক্ষতির মুখ দেখে, তখন ধীরে ধীরে নিজের বা পরিবারের বাস্তব অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এটি এমন এক ভয়াবহ মানসিক নেশায় পরিণত হয় যে, তারা ধারদেনা করে কিংবা চুরি করে হলেও টাকা ঢালতে থাকে। এর ফলে অসংখ্য তরুণ আর্থিকভাবে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা কিছু জানার আগেই একজন তরুণ লাখ লাখ টাকা হারিয়ে ফেলছে। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি পরবর্তীতে তরুণদের চরম মানসিক অবসাদ, পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার মতো সামাজিক ও মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক বাণিজ্যের এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সহজ ও দ্রুততর করে তুলেছে মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা থাকায় জুয়াড়িরা একে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একশ্রেণীর দেশীয় অসাধু এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী এই অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের টাকা হুন্ডি বা ডিজিটাল কারেন্সিতে রূপান্তর করে আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইটগুলোতে স্থানান্তরে সরাসরি সহায়তা করে। এর ফলে পুরো জুয়া কার্যক্রমটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অবৈধ অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে।

এই ডিজিটাল লেনদেনের চেইনটি এতটাই নিখুঁত যে, একে ট্র্যাক করা বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ডিজিটাল ফাঁদের এই ভয়াবহতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক কনটেন্টের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ, নৈতিক ও নতুন প্রজন্মের জন্য উপযোগী রাখতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে- অনলাইনে জুয়া খেলা, বেটিং পরিচালনা করা কিংবা পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত যে কোনো কনটেন্ট তৈরি, প্রচার, প্রকাশ বা তার বিজ্ঞাপন দেয়া একটি মারাত্মক দণ্ডনীয় ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। সরকার এই আইনি কাঠামোর সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে কাজ করে যাচ্ছে। আইনি কড়াকড়ির অংশ হিসেবে দেশের মূলধারার গণমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেল এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সতর্ক ও সচেতন করা হয়েছে। তাদের কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে তারা কোনোভাবেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ধরনের জুয়া বা অনৈতিক অ্যাপের কনটেন্ট বা প্রমোশন প্রচার না করে।

সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও বাস্তবতার জমিনে এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত জটিল ও চতুর প্রযুক্তিগত কৌশলে মোড়ানো। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে একের পর এক নতুন ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ চালু করে চলেছে। সরকারের বিটিআরসি বা সাইবার টিম যখনই একটি নির্দিষ্ট জুয়া বা পর্নো প্ল্যাটফর্মের আইপি বা ডোমেইন ব্লক করে দেয়, অপরাধীরা সঙ্গে সঙ্গে সামান্য নাম পরিবর্তন করে নতুন ডোমেইনে সেটি আবার সচল করে ফেলে। তরুণ সমাজ একটি দেশের বর্তমান এবং আগামী দিনের কর্ণধার।

ডিজিটাল ফাঁদের এই অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী বিষাক্ত ছোবল আমাদের সেই মূল চালিকাশক্তিকেই ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে আমাদের সন্তানদের এবং যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে হলে সমাজের কোনো একটি নির্দিষ্ট একক কাজ করলে হবে না; বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একসাথে একযোগে কাজ করতে হবে।

সরকারের কঠোর আইনি তদারকি, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ব্যবসায়িক নীতি, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঠিক নির্দেশনা এবং সবমিলিয়ে বাবা-মায়ের সচেতন ও বন্ধুত্বপূর্ণ নজরদারির সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ, সচেতন ও নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা যদি আজ এই অদৃশ্য ডিজিটাল মহামারির বিরুদ্ধে রুঁখে না দাঁড়াই, তবে এই সংকট আমাদের পুরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও নৈতিকতাকে গ্রাস করে দেশের জন্য আরও বড় ও অপরিবর্তনীয় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যুবসমাজকে রক্ষা করার এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াই এখন আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় চ্যালেঞ্জ।

Link copied!