নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ২৩, ২০২৬, ০১:২৯ এএম
বাংলাদেশে পাসপোর্ট সেবায় সংকট, দীর্ঘসূত্রতা আর হয়রানি যেন এক স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার সেবাপ্রত্যাশী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
পাসপোর্ট সেবাকে সহজ করতে এবং নাগরিকদের হয়রানি কমাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তুলে দেয়ার মতো একটি ঐতিহাসিক ও বড় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র ও অনলাইন জন্মনিবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্ট ইস্যুর নিয়ম চালু হওয়ায় একটা বড় অংশের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে সত্যি, তবে তৃণমূলের বাস্তব চিত্র এখনো সম্পূর্ণ বদলায়নি।
নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ওপরের স্তরে দুর্নীতি কিছুটা কমলেও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, আনসার সদস্য এবং বাইরের দালাল চক্র মিলে গড়ে তুলেছে নতুন ধরনের ‘পকেট সিন্ডিকেট’। সরাসরি আবেদন করতে যাওয়া নাগরিকদের ফাইলে খুঁটিনাটি ভুল ধরে ফিরিয়ে দেয়া এবং দালালের মাধ্যমে এলে মুহূর্তেই কাজ সম্পন্ন করে দেয়ার এক অলিখিত নিয়ম চলছে দেশের প্রায় প্রতিটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে। প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় দালাল ও তাদের সহযোগী কম্পিউটার দোকানগুলো।
দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সিন্ডিকেটের ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র সবখানেই এক। নরসিংদী, যশোর, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ ও সিলেটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো—
নরসিংদী- ‘চ্যানেল ফি’র মহোৎসব : নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন জমা পড়া আবেদনের একটি বড় অংশই জমা হচ্ছে তথাকথিত ‘চ্যানেল ফি’র মাধ্যমে। এখানে সরাসরি কোনো আবেদনকারী ফাইল জমা দিতে গেলে নানাবিধ সূক্ষ্ম ভুলের অজুহাতে ফাইল আটকে দেয়া হয়। তবে দালালের মাধ্যমে এলে সেই ফাইল কোনো প্রশ্ন ছাড়াই দ্রুত ছাড় পেয়ে যায়। এই অফিসে সরকারি ফির বাইরে দালালরা প্রতি পাসপোর্টের জন্য ৮ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
যশোর- ‘ভিআইপি’ ও ‘নরমাল’ সাংকেতিক ভাষা : যশোর অঞ্চলে কর্মকর্তা ও দালালদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য নিজস্ব কিছু সাংকেতিক ভাষা তৈরি হয়েছে। সেখানে ফাইল দ্রুত ছাড়ানোর জন্য ‘ভিআইপি চ্যানেল’ এবং সাধারণ ফাইলের জন্য ‘নরমাল চ্যানেল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। সাধারণ নিয়মে আসা গ্রাহকরা কাউন্টারে দিনের পর দিন ঘুরলেও দালালের হাত ঘুরে আসা ফাইল কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে জমা হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম- ৯৫ শতাংশ আবেদনকারীই দালালের মুখোমুখি : চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে প্রায় ৯৫ শতাংশ আবেদনকারী বাধ্য হয়ে কোনো না কোনো দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা টাকা আদায়ের পর ফাইলের ওপর একটি বিশেষ ‘চিহ্ন বা মার্কা’ পেনসিল বা কলম দিয়ে লিখে দেয়। কাউন্টারে থাকা ভেতরের কর্মকর্তারা সেই বিশেষ চিহ্ন বা কোড দেখে কোনো প্রশ্ন না করে ফাইল দ্রুত জমা নিয়ে নেন।
মুন্সীগঞ্জ- কম্পিউটারের দোকানই এখন প্রধান দালাল : ই-পাসপোর্ট সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জে দালালির ধরন বদলে গেছে। এখানে অফিসের সামনে গড়ে ওঠা কম্পিউটারের দোকানগুলোই এখন প্রধান দালালের ভূমিকা পালন করছে। এই দোকানগুলো শুধু ফরম পূরণই করছে না, বরং অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট করিয়ে দেয়ার মতো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও দেদার চালিয়ে যাচ্ছে।
সিলেট- ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে শিক্ষার্থীদের টার্গেট : সিলেট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অতীতে বড় বড় দুর্নীতির কারণে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছিল। তবে অফিসের ভেতরের কড়াকড়ি বাড়লেও বাইরে থাকা দালালদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এই দালাল চক্রগুলো মূলত বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জরুরি পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তাকে পুঁজি করে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগারগাঁওসহ বড় বড় অফিসগুলোতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তুলে দেয়ায় আবেদনকারীরা একটা বড় ধরনের পুলিশি হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এখন অনেক দ্রুততম সময়ে এবং ঝামেলাহীনভাবে ডাটা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এই বড় স্বস্তির মধ্যেও রাজধানীসহ বড় বড় অফিসগুলোতে অন্য এক ধরনের ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) বা ছবি তোলার আগে প্রাথমিক কাগজপত্র যাচাইয়ের কাউন্টারগুলোতে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে একটি ফাইল যাচাই করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা চরম অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
আগারগাঁও ও ঢাকার অন্যান্য আঞ্চলিক অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ মানুষ তাদের নির্ধারিত ডেলিভারির তারিখ পার হওয়ার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন না। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না দিয়ে বার বার অফিসে এসে ধর্ণা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াত বাবদ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
পাসপোর্ট সেবাপ্রত্যাশীরা বর্তমানে মাঠপর্যায়ের দালালি ছাড়াও আরেকটি বড় ধরনের ডিজিটাল হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, তা হলো সার্ভার জটিলতা ও কারিগরি ত্রুটি। প্রায়শই দেশের প্রধান ই-পাসপোর্ট সার্ভারে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা বা তথ্য সময়মতো আপডেট না হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারী দূর-দূরান্ত থেকে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার ঠিক আগমুহূর্তে সার্ভারের ত্রুটির কারণে কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না।
ভুক্তভোগীদের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না জানিয়ে পরবর্তীতে আবার নতুন করে তারিখ দেয়া হচ্ছে, যা গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা সাধারণ মানুষের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে অসহনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো স্বচ্ছতার অভাব। কেন বা কোন কারণে একটি ফাইল আটকে আছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা সুনির্দিষ্ট আপডেট পাসপোর্ট অফিস থেকে আবেদনকারীকে জানানো হয় না। পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটে শুধু ‘পেন্ডিং’ স্ট্যাটাস ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। এই তথ্যহীনতা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি অনিশ্চয়তা এবং দালালের খপ্পরে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেয়া বা অনলাইন ডাটাবেজ ব্যবহারের মতো নিয়মের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন হলেও স্থানীয় আঞ্চলিক অফিসগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা প্রশাসনিক দুর্নীতি ও পকেট দালাল সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলা এখনো সম্ভব হয়নি।
পাসপোর্ট সেবার প্রকৃত সুফল এবং রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ সেবার মর্যাদা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে না; বরং স্থানীয় পাসপোর্ট অফিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কাউন্টারে জনবল বাড়ানো, কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা এবং পাসপোর্ট অফিস প্রাঙ্গণকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করার জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, যত বড় সংস্কারই করা হোক না কেন, স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের ডিজিটাল সেবার মহৎ উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে অধরাই থেকে যাবে।