মো. নেয়ামত উল্যাহ
জুলাই ১, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম
একটি শিশুকাল হওয়া উচিত যেখানে ভোরের আলো ফুটতেই শিশির ভেজা ঘাসের ওপর দৌড়ঝাঁপ, বন্ধুদের সঙ্গে গোল্লাছুট, সাইকেল চালানো কিংবা মুক্ত আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ থাকবে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের নগরায়ণ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বাস্তবতায় সেই চিরচেনা দৃশ্যপট বিলীন হয়ে গেছে। আজকের কন্যাশিশুদের শৈশব যেন এক অদৃশ্য দেয়ালের মাঝে বন্দি।
নিরাপত্তাহীনতার চরম সংকট আর যৌন হয়রানির ভীতি তাদের মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে ঘরের কোণে, যেখানে খেলার সাথীর বদলে সঙ্গী হিসেবে এসেছে স্মার্টফোন, ট্যাব আর টেলিভিশন। এই পরিবর্তনটি কেবল শখের বিনোদন বদল নয়, বরং এটি একটি জাতির আগামী দিনের মেরুদণ্ড তৈরির প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ছেদ।
মাঠ হলো শিশুর সামাজিকীকরণের প্রথম পাঠশালা। সেখানে তারা দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, প্রতিকূলতা জয় করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখে। কিন্তু কন্যাশিশুরা যখন এই মাঠ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তারা দলগত নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। নিরাপত্তাহীনতার এই দেয়াল কেবল তাদের শারীরিক বিকাশই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাসকেও খর্ব করছে।
প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার খবর অভিভাবকদের মনে যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করছে, তার ফলশ্রুতিতে অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের নিয়ে অতি-সুরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। তবে এই সুরক্ষার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি বড় সামাজিক ব্যাধি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মেয়েরা যে স্বাধীনতাটুকু পায়, ছেলেরা তার চেয়ে অনেক বেশি পায়। এই বৈষম্যমূলক আচরণ কন্যাশিশুকে শৈশব থেকেই শেখায় যে, পৃথিবীটা তার জন্য নিরাপদ নয়এবং তার জন্য সীমাবদ্ধ গণ্ডিই নির্ধারিত।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি খেলার মাঠ ও জনপরিসরকে শিশুবান্ধব করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আমরা এমন এক প্রজন্ম পাব যারা মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকবে এবং যাদের মধ্যে নেতৃত্বের দৃঢ়তার অভাব থাকবে। শৈশব মানেই হলো নির্ভয়ে পৃথিবীকে আবিষ্কার করা। অথচ আজ আমাদের কন্যাশিশুদের পৃথিবী সংকুচিত হয়ে এসেছে অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা কিংবা বেডরুমের চার দেয়ালের মাঝে। এই সংকট নিরসনে রাষ্ট্র, পরিবার এবং স্থানীয় সমাজকে সম্মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে লিঙ্গপরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু মাঠে দৌড়াবে এবং শৈশবকে শৈশবের মতো উপভোগ করবে।
ভয়ের সংস্কৃতি কাটিয়ে কন্যাশিশুর শৈশবকে চ্যালেঞ্জমুক্ত করাই এখন আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ আজকের এই দেয়ালবন্দি শিশুরাই আগামী দিনের আগামীর নারী, আর তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ার ভিত রচিত হয় এই শৈশবের মাঠেই। ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিকেলে মাঠে ছেলেশিশুদের অবাধ বিচরণ থাকলেও মেয়েরা সেখানে প্রায় অনুপস্থিত।
যাও বা দু-একজন আসে, তারা পরিবারের বড়দের নজরদারিতে আসে এবং দ্রুত ফিরে যায়। রাজধানীর শনির আখড়ার বাসিন্দা ইসরাত ইমু বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় বিকেল মানেই ছিল মাঠের স্বাধীনতা। অথচ আজ নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে নিজের সন্তানকে বারান্দার বাইরে নিতেও গা শিউরে ওঠে।’ এমন প্রতিটি পরিবারই আজ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে।
রাজধানীর ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ১২ বছর বয়সি সাইয়ারা (ছদ্মনাম) জানায়, আগে সে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে যেত। এখন সপ্তাহে একদিনও যাওয়া হয় না। মা ভয় পায়। বলে, একা বাইরে যাওয়া যাবে না। তাই বাসায় বসে ফোন দেখি বা বই পড়ি, বলে সে। তার কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান সময়ের অনেক মেয়েশিশুর বাস্তবতা। তাদের শৈশবের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে ঘরের দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. কামাল উদ্দিনের মতে, খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং শিশুর সামাজিক দক্ষতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। তিনি বলেন, ‘মাঠে খেলার মাধ্যমে শিশু দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব দেয়া এবং দ্বন্দ্ব মোকাবিলার মতো গুণাবলী অর্জন করে। নিয়মিত মাঠে যেতে না পারার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত ভীতি, অনিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব।’ এছাড়া শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্ক্রিন-নির্ভরতার ফলে বিশ্বজুড়েই শিশুদের স্থূলতার হার বাড়ছে, যা বাংলাদেশেও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি সামাজিক রক্ষণশীলতাও মেয়েদের শৈশবকে সংকুচিত করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা লুৎফা বলেন, ‘ছেলেশিশুদের যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই দেয়া হয় না। এখানে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অনেক সময় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যদি আমরা কেবল মেয়েদের চলাফেরা সীমিত করে সমস্যার সমাধান খুঁজি, তবে সমাজ তার আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম একটি প্রজন্মকে হারাবে।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল পরিবারের একার দায়িত্ব নয়। তিনি বলেন, ‘খেলার মাঠ ও পার্কগুলোকে শিশুবান্ধব করতে হবে। পাশাপাশি যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা এবং শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো জরুরি।’
শৈশব মানেই তো মুক্ত বাতাসে ডানা মেলে দেয়ার অধিকার। কিন্তু আজকের অনেক শিশুর কাছে শৈশব মানেই ট্যাব, স্মার্টফোন আর চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতা। নিরাপত্তাহীনতার এই জাল ছিঁড়ে কন্যাশিশুরা আবারও নির্ভয়ে মাঠে ফিরবে এমন একটি নিরাপদ সমাজ গড়াই এখন আমাদের তথা বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মনে রাখতে হবে, মাঠ হারানো মানে কেবল খেলার সুযোগ হারানো নয়, এটি আগামীর এক সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্বের স্বপ্ন হারানো। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে প্রতিটি মেয়েশিশু নির্ভয়ে বেড়ে উঠবে, আর তাদের মুখর হাসিতে আবার প্রাণ ফিরে পাবে খেলার মাঠগুলো।