ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

গ্রামের মেধা ও সক্ষমতার নীরব প্রস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই ১৩, ২০২৬, ০১:০৭ এএম

গ্রামের মেধা ও সক্ষমতার নীরব প্রস্থান
  • কেবল অভাব নয়, বরং শারীরিক সুস্থতা এবং শিক্ষার স্তর এই দুটি বিষয়ও অভিবাসনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে
  • গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব

বাংলাদেশের গ্রামগুলো আবহমানকাল ধরে এই বদ্বীপের মেধা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে গ্রামীণ জনপদ থেকে এক অদ্ভুত ও নিরবচ্ছিন্ন ‘মেধা ও সক্ষমতার প্রস্থান’ লক্ষ করা যাচ্ছে, যা এখন এক সামাজিক সংকটের আকার ধারণ করেছে। প্রথাগতভাবে আমরা মনে করতাম, মানুষ কেবল অভাবের তাড়নায় বা দারিদ্র্য মোচনের আশায় গ্রাম ছাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও বিংহামটন ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক সময়ের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলছে, গ্রামের এই পরিবর্তন কেবল দারিদ্র্যকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি এখন মেধা ও শারীরিক সক্ষমতার এক পরিকল্পিত স্থানান্তর। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে চালানো গবেষণার ফলাফল আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যারা দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধিহীন, শারীরিকভাবে সুস্থ এবং উচ্চশিক্ষিত, তারাই সবচেয়ে বেশি গ্রাম ছেড়ে শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

এই প্রস্থান প্রক্রিয়াটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘হেলদি মাইগ্র্যান্ট ইফেক্ট’ বা সুস্থ অভিবাসী প্রভাবের আওতায় গ্রাম থেকে সেই অংশটিই বেরিয়ে যাচ্ছে, যারা ছিল গ্রামীণ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন তরুণের গ্রাম ছাড়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষিত ও সক্ষম যুবকদের এই ব্যাপক হারে গ্রাম ত্যাগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘শূন্যতা’ তৈরি করছে।

গ্রামগুলোয় এখন কেবল বয়স্ক এবং শিক্ষায় ও সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা মানুষই বেশি থাকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ নেতৃত্ব ও উৎপাদনশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক সচলতার আকাঙ্ক্ষা এবং তথ্যের সহজলভ্যতা এই তিনটি প্রধান অনুষঙ্গ শিক্ষিত তরুণদের গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক অসম সামাজিক ভারসাম্য। একদিকে প্রবাসী আয় গ্রামীণ পরিবারগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ালেও, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে মেধা ও নেতৃত্বের সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। গ্রামের স্কুল, কৃষি খামার বা ছোট উদ্যোগগুলোতে আজ দক্ষ ও আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের অভাব।

এই নীরব প্রস্থান বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ যদি অব্যাহত থাকে, তবে গ্রামীণ জনপদ অদূর ভবিষ্যতে কেবল একটি আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে, যেখানে কোনো সৃজনশীল উদ্দীপনা অবশিষ্ট থাকবে না। গবেষণার এই ফলাফল কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সংকেত।

গ্রামকে আধুনিকায়ন না করলে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এবং শিক্ষিত তরুণদের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্র তৈরি না করলে এই মেধাশূন্যতা রোধ করা অসম্ভব। আজকের গ্রামীণ জীবন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সে কী তবে তার সেরা সম্পদগুলো হারিয়ে কেবল স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকবে, না কি এই মেধার প্রস্থান রোধে নতুন কোনো সামাজিক চুক্তির প্রয়োজন পড়বে? আইসিডিডিআরবির এই গবেষণালব্ধ তথ্য আমাদের সেই মৌলিক প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

জনসংখ্যাবিদদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো ‘হেলদি মাইগ্র্যান্ট ইফেক্ট’। অর্থাৎ, তুলনামূলকভাবে শারীরিকভাবে সক্ষম ও সুস্থ ব্যক্তিরাই অভিবাসনের পথে হাঁটেন। আইসিডিডিআরবি এবং বিংহামটন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা চাঁদপুরের মতলব এলাকায় ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা ২১ বছর ধরে ৩ হাজার ৭৫৬ তরুণ-তরুণীর ওপর একটি ফলোআপ স্টাডি চালিয়েছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হেলিওন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার ফল বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণায় শারীরিক সক্ষমতাকে তিনটি সূচকে মাপা হয়েছে: দীর্ঘস্থায়ী রোগ, সাময়িক অসুস্থতা এবং স্বাস্থ্যের নিজস্ব মূল্যায়ন। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী- দীর্ঘস্থায়ী রোগ: যাদের কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (যেমন দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, শ্বাসকষ্ট) নেই, তাদের অভিবাসনের হার সবচেয়ে বেশি।

অসুস্থতার বাধা: দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিবাসনের সম্ভাবনা সুস্থদের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। আর যাদের একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ২৭ শতাংশ কম। মানসিক প্রভাব : মূলত দীর্ঘস্থায়ী রোগ মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যার ফলে তারা অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমানোর ঝুঁকি নিতে ভয় পান। বিপরীতে, জ্বর বা সাধারণ ডায়েরিয়ার মতো সাময়িক অসুস্থতা অভিবাসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না।

গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে, শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন তরুণের গ্রাম ছাড়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের গ্রাম ছাড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের মতে, এর পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে— ১. উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব: গ্রামীণ অর্থনীতিতে শিক্ষিত তরুণদের মেধা ব্যবহারের মতো শিল্প বা পেশাগত ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। ২. সামাজিক সচলতা: শিক্ষিত মানুষ তাদের শিক্ষার মান ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে শহরের পরিবেশ ও উন্নততর সুযোগ খুঁজছেন। ৩. তথ্যের সহজলভ্যতা: ডিজিটাল যুগে শিক্ষার প্রসারের ফলে তরুণদের কাছে শহরের সুযোগ-সুবিধার তথ্য দ্রুত পৌঁছাচ্ছে, যা তাদের গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্য দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা। আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ও এই গবেষণার অন্যতম গবেষক মো. মঈনউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এই নীরব প্রস্থান গ্রামীণ জীবনকে বদলে দিচ্ছে। গ্রামের মেধাবী ও সক্ষম অংশটি চলে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো দক্ষ মানুষের অভাব দেখা দিচ্ছে।’ যদিও অভিবাসী তরুণদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিবারের সচ্ছলতা ফেরায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গ্রামে মেধার ‘শূন্যতা’ তৈরি হচ্ছে।

এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে গ্রামে মূলত বয়স্ক ও শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানুষই বেশি থাকছেন, যা সামগ্রিক গ্রামীণ উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। লিঙ্গবৈষম্য: পুরুষদের মধ্যে অভিবাসনের হার (৫৭ শতাংশ) নারীদের (৩১.৫ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি। পুরুষরা মূলত অর্থনৈতিক কারণে এবং নারীরা বিয়ের সূত্রে গ্রাম ছাড়েন। বয়সের প্রভাব: ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণরাই অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। সম্পদের ভূমিকা: পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অভিবাসনের খরচ মেটাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে সম্পদশালী তরুণরাই বেশি সফল হচ্ছেন।

আইসিডিডিআরবির এই গবেষণা আমাদের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অভিবাসন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং এটি মেধা ও সক্ষমতার এক ‘নিঃশব্দ বহিঃপ্রবাহ’। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রামে কেবল কৃষি নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক শিল্পায়ন ঘটানো না গেলে এই ‘মেধাশূন্যতা’ রোধ করা কঠিন হবে। গ্রামীণ জনপদকে কেবল বেঁচে থাকার জায়গা নয়, বরং শিক্ষিত তরুণদের ‘স্বপ্ন পূরণের জায়গা’ হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অন্যথায়, উন্নয়নশীল বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত গ্রামগুলো কেবলই বয়স্ক ও নির্ভরশীল মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

Link copied!