দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
অক্টোবর ৩, ২০২২, ০১:২০ পিএম
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় গবাদিপশুর লাম্পিস্কিন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। দিনদিন এখানকার বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর মাঝে এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ ভাগ পশু রোগটিতে কমবেশি সংক্রমিত হয়েছে। এতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকসহ ছোট-বড় খামারিরা। এমনিতেই গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে, তার ওপরে এই সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ায় এখন দিশাহারা অবস্থা খামারিদের।
তবে এই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কার্যকর কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না, বরং রোগকে পুঁজি করে প্রাণি চিকিৎসক অবৈধভাবে অর্থ আয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন বলে গবাদিপশু পালনকারী কৃষক ও খামারিদের অভিযোগ।
খামারিরা জানান, লাম্পিস্কিন ডিজিসে আক্রান্ত গরুর শরীরে প্রথমে ফোসকা দেখা দিচ্ছে। পরে তা চাকা চাকা হয়ে গরুর সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে। গলা ও পা ফুলে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরছে।
শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। আক্রান্ত গরু দুর্বল হয়ে পড়ায় শুয়ে থাকলে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। আবার কখনো দাঁড়ালেও খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
গবাদিপশুর লাম্পিস্কিন ডিজিস রোগ ইতোমধ্যে উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সুচিকিৎসার অভাবে অনেকের গরু মারাও গেছে।
ভুক্তভোগী খামারিরা অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তারা ঠিকমতো গবাদিপশুর চিকিৎসা দিতে চান না, গড়িমসি করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
পশু হাসপাতাল নামে অধিক পরিচিত সেখানকার চিকিৎসককে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসার জন্য ডাকা হলে তিনি সুযোগ বুঝে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা ভিজিট আদায় করেন। নিয়মবহির্ভূত এই ভিজিটের টাকা না দিলে তিনি যেতে চান না।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুল ইসলাম টাকা ছাড়া কোথাও যান না।
কেউ গবাদিপশু নিয়ে তার কাছে এলে তিনি নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেন। ভুক্তভোগীরা বাধ্য হয়ে তাকে বাড়িতে ডাকেন। পরে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্ধারিত ভিজিটসহ অন্তত তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আদায় করেন।
উপজেলা পরিষদের পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে মানিকদিয়াড় গ্রামের তুফান মন্ডল, পশ্চিমপাড়ার নুর মোহাম্মদ ও পূর্বপাড়া গ্রামের আনারুল ইসলাম জানান, তাদের গরুর গায়ে গোল গোল ফোসকা ও ঘা হওয়ায় গরু নিয়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যান। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
পরে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সামনের দোকান থেকে ওষুধ কেনেন তারা। ওষুধের পেছনে একেকজনের ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেলেও এখনো তাদের গরু সুস্থ হয়নি।
তুফান মন্ডল জানান, তার গরুর পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে যে ঘা হয়েছে তা আর ভালো হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দিনদিন সেই ঘা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেখানে পচন ধরে পোকা হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ দপ্তরের চিকিৎসক বাড়ি অথবা খামারে আসলে তার মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচ দিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সরকারি জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে ভিজিট এবং দাবি করা অন্যান্য টাকা কেন দিতে হবে।
সরকার তাকে বেতন দেয়, বিনা পয়সায় সেবা প্রদান করাই তার কাজ। তা না করে উল্টো রোগটিকে পুঁজি করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে টাকা আদায় করে আসছেন তিনি। এখানে নতুন যোগ দিয়ে চিকিৎসার চেয়ে অবৈধ অর্থ আয়ের প্রতিই বেশি ঝুঁকে পড়েছেন এই প্রাণি চিকিৎসক।’
এদিকে গরুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় রোগাক্রান্ত গরুর পরিচর্যা করতেও ভয় কাজ করছে অনেকের মধ্যে। তবে এটি সংক্রামক বা ভাইরাসজনিত রোগ হলেও এতে মানুষ আক্রান্ত হয় না বলে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের চিকিৎসক জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রানিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুল ইসলাম মোবাইল ফোনে জানান, লাম্পিস্কিন ডিজিস (এলএসডি) রোগটি করোনার মতোই গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত নতুন রোগ। দেশে এর ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি।
এই রোগ প্রধানত মশা-মাছি, কীট-পতঙ্গের মাধ্যমে ছড়ায়। গবাদিপশুর এমন রোগ দেখা দিলে মশারির মধ্যে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
আক্রান্ত গবাদিপশু আলাদাভাবে রাখার কথা বলেন। এই রোগের বিষয়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে গিয়ে পরামর্শ নেয়ার কথাও জানান। তবে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
টিএইচ