ওসমান হোসাইন, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫, ০৩:০৪ পিএম
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা তালুকদার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে মামলার আলামত হিসেবে ২৩ বস্তা নথিপত্র উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার ভোরে দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, জাবেদের দেশে-বিদেশে অর্জিত অবৈধ সম্পদ ও টাকা পাচারের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ওই বাড়িতে গোপনে রাখা ছিল।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আরামিট গ্রুপের দুই এজিএম—আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালের জবানবন্দির ভিত্তিতেই এই অভিযান পরিচালিত হয়। উৎপল পাল দীর্ঘদিন জাবেদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন। তার ল্যাপটপ ও মোবাইল থেকে অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণও পাওয়া গেছে।
দুদকের দাবি, দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন উৎপল পাল। অন্যদিকে, আব্দুল আজিজ জাবেদের সম্পদ কেনা-বেচা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানা যায়, মন্ত্রী জাবেদের স্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইলিয়াস তালুকদারের বাড়িতে কয়েক বস্তা নথিপত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সন্ধ্যায় কর্ণফুলীর শিকলবাহা ফকিরা মসজিদ এলাকার তালুকদার বাড়িতে অভিযান চালায় দুদক। তবে তখন কোনো নথি উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এ সময় আশপাশের কিছু সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করা হয়।
অভিযানে ইলিয়াস তালুকদারকে না পেয়ে তার স্ত্রী লাকী আক্তার (৩০) ও প্রতিবেশী সাহাব উদ্দিন তালুকদারের স্ত্রী ঝুমা আক্তারকে (২৬) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে দুদক।
পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের কর্ণফুলী থানার মাধ্যমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
জব্দ করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শনিবার দিবাগত রাতে আবারও অভিযান চালায় দুদক। প্রায় দুই ঘণ্টার এই অভিযানে ২৩ বস্তা নথিপত্র উদ্ধার করা হয়।
এ সময় দুদকের ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মশিউর রহমান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলম ও কর্ণফুলী থানা পুলিশের একটি টিম উপস্থিত ছিলেন।
দুদক জানায়, উদ্ধারকৃত নথিপত্রের মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপ ও তার পরিবারের বিভিন্ন সম্পদের কাগজপত্র রয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের কালুরঘাটে আরামিট গ্রুপ কার্যালয় থেকে রুকমিলা জামানের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইলিয়াস এই নথি এনে তালুকদার বাড়িতে রাখেন।
দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমান বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে কাউকে আটক করা যায়নি। ড্রাইভার ইলিয়াস ও তার চাচাতো ভাই ওসমান পলাতক রয়েছেন। উদ্ধার করা নথি বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।”
এ মামলায় জাবেদ, তার স্ত্রী, ভাই-বোন ও আরামিট গ্রুপের কর্মকর্তাসহ মোট ৩১ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুদক জানায়, ২০১৯–২০ সালে ভূমিমন্ত্রী থাকাকালে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪–১৮ মেয়াদে ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯–২৩ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তার বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর তাকে আর মন্ত্রিসভায় দেখা যায়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে চলে যান বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।
বর্তমানে জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছে দুদক।
ইএইচ