নুরুজ্জামান সেখ, শরীয়তপুর
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৪:৩৭ পিএম
অসৎ উদ্দেশ্যে মোবাইল ফেসবুকে প্রথম বন্ধুত্ব তৈরি, পরিশেষে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিভিন্ন কৌশলে সৃষ্টি করে প্রেমের আলামত। প্রেমের আলামত হাতে পেলেই বিভিন্ন কৌশলে পরিবার থেকে শুরু করে ব্ল্যাকমেইল। ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার দাবি পূরণ না করলে ধর্ষণ মামলা দিয়ে হয়রানি করার এমন অভিযোগ উঠেছে প্রতারক নারী চক্রের অন্যতম সদস্য লিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শরীয়তপুর এবং ঢাকার কয়েকজন ব্যক্তি লিয়া আক্তার নামে ওই নারীকে দিয়ে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহার করে অর্থশালী ও বিত্তবান পরিবারের যুবকদেরকে প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে ব্ল্যাকমেল করে বিভিন্ন হয়রানিমূলক ধর্ষণ মামলা দিয়ে মীমাংসার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
মোবাইল ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমোর মাধ্যমে প্রেম করে অর্থনৈতিক আয়ের একমাত্র উপায় বেছে নিয়েছে এই চক্রটি।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লিয়া আক্তার নামে ওই নারীর প্রেমের জালে জড়িয়ে ধর্ষণ মামলা হয়েছে শরীয়তপুর গোসাইরহাট উপজেলার উত্তর হাটুরিয়া গ্রামের মকবুল ঢালীর পুত্র মো. বাইজিদ ঢালীর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী বাইজিদ ঢালী বলেন, ‘আরিফশা নামে ফেসবুকে আমার বন্ধুত্ব হয়। ধীরে ধীরে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আরিফশার সাথে টুকিটাকি হাই-হ্যালো কথা হতো। এই হাই-হ্যালো কথার মধ্যেদিয়ে আমাদের দুজনের মধ্যে গভীর ভাব বন্ধুত্ব তৈরি হয়। আমি ওর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি আমাকে বলেন, আমি একজন কলেজ ছাত্রী, আমার মা সরকারি চাকরি করে, বাবা নেই, আমি অবিবাহিত।
সত্যি কথা বলতে কি, ওর কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে মোবাইল মেসেঞ্জারের মাধ্যমে আমাদের দুজনের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আমরা দুই থেকে তিন মাস মোবাইলেই কথা বলি। এই ২-৩ মাসের ভিতরে কারো সাথে দেখা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে একদিন সরকারি শামসুর রহমান কলেজে হাজির হয় আমার সাথে দেখা করার জন্য। আমি ওইদিন কলেজে ছিলাম না। কলেজে আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা হয় এবং লিয়া আক্তার নামে পরিচয় দেয়। আমি তো লিয়াকে চিনি না। পরের দিন লিয়া আক্তার নামে ওই নারীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতে জানতে পারলাম লিয়া আক্তার ওরফে আরিফশা।
আমার বন্ধু আমাকে বলে, ওই মেয়েকে কি তুই চিনিস? ওর সম্পর্কে তুই কতটুকু জানিস? ও তো বিবাহিত, ওর স্বামী আছে এবং একটা বাচ্চা আছে যার নাম আরিফশা। লিয়া আক্তার ওর আসল নাম। ওর বাড়ি নাগেরপাড়া, রানী সার।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওর সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার চেষ্টা করলাম এবং জানতে পারলাম যে, ওর চরিত্রে সমস্যা আছে। একাধিক ছেলেদের সাথে সম্পর্ক চলমান, মাঝেমধ্যে কক্সবাজার হোটেলে যাতায়াত আছে, রাতে ঘরের ভিতর অশালীন অবস্থায় বিভিন্ন ছেলেদের সাথে ইমোতে চ্যাটিং করে। স্বামী থাকা অবস্থায় এসব অশালীন কাজ চলমান। স্বামী শুভর সাথে তালাক বা ডিভোর্স হয়নি। ছেলেদেরকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ওর সম্পর্কে এসব কথা জানার পর ওর থেকে কেটে পড়ার চিন্তা করলাম।
আমি তো জানতাম না অসৎ উদ্দেশ্যে চক্রটি লিয়া আক্তার নামে ওই নারীকে আমার পিছনে লেলিয়ে দিয়েছে, মান-সম্মান, ইজ্জত, ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য। আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যার বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া। লিয়া আক্তার গোসাইরহাট বাজারের কাছে দাসের জঙ্গল বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। একদিন বিকেল বেলা আমাকে মোবাইল ফোনে অনেক কান্নাকাটি করে বাসায় যেতে বলে। আমি ওকে বিশ্বাস করে তখন ওই বাসায় যাই।
ওই বাসায় যাওয়ার পর লিয়া আক্তার অসৎ উদ্দেশ্যে চক্রের কথামতো আমাকে আটকে রেখে ডাক-চিৎকার দেয় এবং লোকজনের মাধ্যমে আমার পরিবারকে খবর দিলে আমার পরিবারের লোকজন এসে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
পরবর্তীতে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়টিকে সমাধানের চেষ্টা করে। লিয়া আক্তারের গার্জিয়ান না থাকায় লিয়া আক্তারের পক্ষ থেকে সাংবাদিক মাহবুব, অ্যাডভোকেট গার্জিয়ান হন।’
এদিকে বিষয়টি সমাধানের জন্য লিয়ার পক্ষ থেকে সাংবাদিক-উকিল, বাইজিদ ঢালীর পরিবারের থেকে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করেন। ওই ১০ লক্ষ টাকা দাবি পূরণ না করায় চক্রটি লিয়া আক্তারকে দিয়ে শরীয়তপুর জজ আদালতে গত ২১ মে বাইজিদ ঢালীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলাসহ পর্নোগ্রাফি মামলা করেন।
ধর্ষণের আলামত প্রমাণ করার জন্য গোসাইরহাট থানার পুলিশ লিয়া আক্তার নামে ওই নারীকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তারদের মাধ্যমে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তারি প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন। ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একাধিক ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্ক।
জানা গেছে, এই চক্রটি লিয়া আক্তার ও ফারিয়া নামের নারীদেরকে ব্যবহার করে সমাজের অর্থ-বিত্তবান পরিবারের যুবক ছেলেদেরকে প্রেমের জালে জড়িয়ে বিভিন্ন আলামত সৃষ্টি করে মোটা অংকের অর্থের জন্য লিগ্যাল এইড, থানা, আদালতে মামলা-মোকদ্দমার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
মামলার বাদী লিয়া আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ‘বাইজিদ ঢালী বিয়ের কথা বলে আমার সাথে সম্পর্ক করে। বিয়ে করতে রাজি হয়নি বিধায় আমি মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। আমি ৫ লাখ টাকা চেয়েছি, সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দিলে আমি মীমাংসা করব।’
ইএইচ