আজিজুল হক, চট্টগ্রাম ব্যুরো
জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম
চট্টগ্রামের রাউজানে চলমান সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পরও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তবে তিনি সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধ অস্ত্র আসা এবং প্রশাসনের ভেতরে ফ্যাসিবাদের অনুসারীদের সক্রিয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের গুডস হিলের বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, “রাউজান এখনো ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি। ফ্যাসিস্টদের হাতে প্রচুর অবৈধ টাকা আছে এবং বিভিন্ন জায়গায় সেই টাকার অপব্যবহার হচ্ছে।”
সম্প্রতি রাউজানে যুবদলের এক কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য তাকে সহায়তা করা হয়েছিল। তার ঘরে ঢুকে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসীদের দায় নয়, প্রশাসনের ভেতরেও তাদের অনুসারীরা ঘাপটি মেরে বসে আছে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে তিনি সন্তুষ্ট। অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি আগের ২০ বছরে দেখা যায়নি। কয়েকজন ওসি বদলির ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
তবে অস্ত্র পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, একদিকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে প্রচুর অস্ত্র ঢুকছে।
মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে এবং দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনি তার পক্ষেই কাজ করবেন। বিকল্প মনোনয়নের বিষয়টিকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের গুম, খুন, ধর্ষণ ও অকথ্য নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট ছিল আমার প্রাণের রাউজান। গত ৫ আগস্ট ২০২৪ এ ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে রাউজান আওয়ামী ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়েছিল বলে সবাই ভেবেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সমগ্র বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হলেও আমার প্রাণের রাউজান আজও আওয়ামী ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়নি। ৫ আগস্টের পূর্বে রাউজানের সাধারণ জনগণসহ প্রকৃত ও সাচ্চা বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা দুর্বিষহ জীবন যাপন করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “শুধুমাত্র আমার নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আমার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান এবং আমার অনুসারী হওয়ার কারণে রাউজানে বিএনপির প্রকৃত আদর্শ লালনকারী আমার নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাদের পিটিয়ে ও গুলি করে খুন করা হয়েছে। মিথ্যা মামলা ও অস্ত্র দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর পাশাপাশি জুমার নামাজের সময় পবিত্র মসজিদ থেকে হাজারো মুসল্লির সামনে টেনে-হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপির একজন সাধারণ সমর্থক পর্যন্ত রাউজানে থাকতে পারেনি। এমনকি তারা মা-বাবার দাফন-কাফন ও জানাজা পর্যন্ত পড়তে পারেনি; করতে পারেনি ঈদের নামাজ, শবদাহ কিংবা শারদীয় দুর্গোৎসব।”
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী অভিযোগ করেন, ওই দুর্বিষহ সময়ে বিএনপি দাবিদার একটি ক্ষুদ্র মহল তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সাথে আঁতাত করে রাউজানে অবস্থান করাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করেছিল। তারা চট্টগ্রাম শহরে অবস্থানকারী নেতা-কর্মীদের বাসার ঠিকানা পর্যন্ত পুলিশকে সরবরাহ করেছিল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নুরুল আলম নুরুকে রাতের আঁধারে বাসা থেকে পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল কর্মী হেজা হাসেমকে এবং মসজিদ চত্বরে মুসল্লিদের সামনে হত্যা করা হয়েছিল মুসাকে। সেই অভিশপ্ত সময়ে বিএনপি দাবিদার আওয়ামী লীগের ওই ‘বি’ টিম কোনো প্রতিবাদ তো করেইনি, উল্টো উল্লাসে মেতে উঠেছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে ফটিকছড়ির এক জনসভায় শেখ হাসিনাকে নিয়ে দেওয়া সত্য ভাষণকে কেন্দ্র করে ইফতারের সময় তার ‘গুডস হিল’ বাসভবনে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। মিথ্যা মামলায় তাকে ৬ মাস কারা যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে মাত্র ৪ জন সাক্ষীর ভিত্তিতে তাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই দিনও আওয়ামী লীগের দালালেরা নীরব থেকে সাধুবাদ জানিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, “মিথ্যা মামলায় হত্যা করা হয়েছে আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, উপমহাদেশের প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাউজানে আমার গাড়িতে ৪ বার গুলিবর্ষণ ও হামলা করা হয়েছিল। হাজারো জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও ইসলামী মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতি থেকে আমাকে একচুল পরিমাণও দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার।”
ইএইচ