কুমিল্লা প্রতিনিধি
জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায় দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফের রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে।
উপজেলার বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ আলিয়ারা গ্রামে শুক্রবার জুমার নামাজের প্রাক্কালে সশস্ত্র হামলায় দুজনকে গুলি করে এবং হাত পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা হলেন সালেহ আহমেদ এবং তার ভাতিজা দেলোয়ার হোসেন ওরফে নয়ন।
এ বর্বরোচিত হামলায় আরও অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাঙ্গলকোট থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দক্ষিণ আলিয়ারা গ্রামের প্রয়াত ইউপি সদস্য ছালেহ আহম্মদ গোষ্ঠী এবং খায়ের আহমেদ গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলে আসছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খায়ের আহমেদ গোষ্ঠীর প্রায় দুই শতাধিক সশস্ত্র সদস্য ছালেহ আহম্মদ গোষ্ঠীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা এবং দেশি অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়।
নিহত দেলোয়ারের বোন হাজেরা আক্তারের বর্ণনায় উঠে এসেছে সে বিভীষিকা। তিনি বলেন, আলাউদ্দিন মেম্বার নিহত হওয়ার পর তারা আমাদের সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। প্রাণভয়ে বাইরে থাকার পর কয়েক দিন আগে আমরা বাড়ির ভিটায় তাঁবু টানিয়ে থাকতে শুরু করি। আজ দুপুরে আলাউদ্দিন মেম্বারের ছেলেসহ শত শত সন্ত্রাসী আমাদের ঘিরে ফেলে। তারা আমার ভাই ও চাচার ওপর সরাসরি গুলি চালায়। শুধু তাই নয়, মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাটিতে ফেলে তাদের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়। আমরা এখন আমাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা দেখছি না।
হামলার পরপরই আহতদের উদ্ধার করে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জানান, সালেহ আহমেদ ও দেলোয়ার হোসেনকে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল। নিহতদের শরীরে ছররা গুলির অসংখ্য চিহ্ন এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাত ও পায়ের রগ কাটার ক্ষত রয়েছে।
এদিকে, আহত আরও পাঁচজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ সংঘাতের শিকড় অনেক গভীরে।
গত বছরের ২৫ জুলাই দুই গোষ্ঠীর দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ২৫ জন আহত হয়েছিলেন। সে ঘটনার জের ধরে ৩ আগস্ট খায়ের আহমেদ গোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য আলাউদ্দিনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে ছালেহ আহম্মদ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
আলাউদ্দিন হত্যার পর এলাকাছাড়া হয়েছিল ছালেহ আহম্মদ গোষ্ঠীর সদস্যরা। দীর্ঘ প্রবাস বা পলাতক জীবন শেষে গত ৩ জানুয়ারি তারা গ্রামে ফেরার চেষ্টা করলে পুনরায় উত্তেজনা তৈরি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ একাধিকবার দুই পক্ষকে নিয়ে শান্তি আলোচনার চেষ্টা করলেও খায়ের আহমেদ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিশোধের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। আজকের এ হামলাকে গত বছরের হত্যাকাণ্ডের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর বক্সগঞ্জ ইউনিয়নে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অভিযুক্ত খায়ের আহমেদ গোষ্ঠীর সদস্যরা বর্তমানে এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছে। পুলিশ গ্রামে প্রবেশ করার পর দেখা গেছে অধিকাংশ বাড়িতে কেবল নারী ও শিশুরা অবস্থান করছে। গ্রামবাসী ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। নিহতদের শরীরে গুলির আঘাত এবং রগ কাটার চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
তিনি আরও যোগ করেন, অভিযুক্তরা সবাই পলাতক। তবে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো নতুন সহিংসতা না ঘটে। ঘাতকদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে। নাঙ্গলকোটের এ জোড়া খুনের ঘটনা পুরো কুমিল্লা জেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সাধারণ মানুষের দাবি, এ গোষ্ঠীগত সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে আগামীতে আরও বড় ধরনের রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
ইএইচ