আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। গত চার দশক ধরে যা পরিচিত সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা এই দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা নতুন নয়, তবে এবার সেই নৃশংসতা ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ড। গত সোমবার এক অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন র্যাবের উপসহকারী পরিচালক ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
আহত হয়েছেন আরও তিন র্যাব সদস্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এবং এলাকা দখলের লড়াই। মূলত এক পক্ষ র্যাবকে ভুল তথ্য দিয়ে অন্য পক্ষকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
হামলার নেপথ্যে তথ্যদাতা ও ভুল তথ্যের ফাঁদ প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মো. ইয়াসিন এবং রোকন উদ্দিনের বাহিনীর মধ্যে চরম বিরোধ চলছিল। সোমবার ইয়াসিনের পক্ষ এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনের ঘোষণা দেয়। এই খবর পেয়ে র্যাবের ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল সেখানে অভিযানে যায়। র্যাবের সাথে থাকা তাদের তথ্যদাতাকে বা সোর্সকে দেখামাত্রই উত্তেজিত হয়ে ওঠে ইয়াসিনের অনুসারীরা।
তারা মনে করেছিল, প্রতিপক্ষ রোকন গ্রুপ র্যাবকে ব্যবহার করে তাদের নিশ্চিহ্ন করতে এসেছে। উত্তেজিত সন্ত্রাসীরা তথ্যদাতা এবং সাদাপোশাকে থাকা র্যাব সদস্যদের ওপর ইট পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অধিকাংশ র্যাব সদস্য আত্মরক্ষার্থে সরে আসতে পারলেও চারজন সদস্য ও তথ্যদাতাকে আটকে ফেলে সন্ত্রাসীরা। এরপর তাঁদের অটোরিকশায় করে পাহাড়ের প্রায় তিন কিলোমিটার গভীরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়।
নিহত ও আহতদের অবস্থা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এসপি মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ দল দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে চার র্যাব কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলেও কর্তব্যরত চিকিৎসক ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত বাকি তিন সদস্য বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচ চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন এবং তাঁরা এখন আশঙ্কামুক্ত।
সলিমপুরের দুই ত্রাস জঙ্গল সলিমপুরের ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড় এখন মূলত দুই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে। এক, মো. ইয়াসিন, যিনি এক সময় সীতাকুণ্ডের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে দাবি করছেন। দুই, রোকন উদ্দিন, যিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে পাহাড় দখল ও অস্ত্র বাণিজ্যের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তিনিও নিজেকে আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও আসলাম চৌধুরী এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই এবং এই ঘটনার সাথে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই।
আধিপত্যের রক্তাক্ত ইতিহাস জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে। গত বছরের অক্টোবরেও এই দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খলিলুর রহমান নামের একজন নিহত হন। সেই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের মারধরের শিকার হয়েছিলেন দুই সাংবাদিক। সম্প্রতি একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে, যেখানে রোকন উদ্দিনকে ছিন্নমূলে যুদ্ধ করার জন্য অস্ত্র কেনার কথা বলতে শোনা যায়। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, অডিওটি রোকনেরই।
বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে এই জঙ্গল সলিমপুর। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। দুর্গম পাহাড় হওয়ায় এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি ও প্লট তৈরি করা হয়েছে। এলাকাটিতে ঢোকার মুখে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সন্ত্রাসীদের নিজস্ব গোয়েন্দা ও সশস্ত্র পাহারাদার থাকে।
র্যাবের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন এত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের এলাকায় মাত্র ৫০ জন সদস্য নিয়ে কেন অভিযানে গেল র্যাব, এমন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান গতকাল জানিয়েছেন, অভিযান সফল হবে এমন একটি প্রাথমিক ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। কোনো কৌশলগত ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ঘটনার পর থেকে ইয়াসিন ও রোকন দুজনেই পলাতক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা হামলার দায় অস্বীকার করলেও পুলিশ তাদের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে দেখছে। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর ও সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই সন্ত্রাসীদের আস্তানা চিরতরে গুঁড়িয়ে দিয়ে সরকারি পাহাড় উদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
জেএইচআর