আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে জনমনে যে আতঙ্ক ও রহস্য দানা বেঁধেছিল, তার যবনিকা ঘটেছে এক লোমহর্ষক সত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে। একাধিক স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া মানবদেহের খণ্ডিত অংশগুলো জেলার রাউজান উপজেলার বাসিন্দা মো. আনিসের বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
একজন পেশাদার কসাই হয়েও আনিসকে প্রাণ দিতে হয়েছে অত্যন্ত বীভৎসভাবে, তাঁর শরীরের ছয়টি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে খালের পাড় ও ময়লার ভাগাড় থেকে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর পরিকল্পিত খুনের নীল নকশা, যেখানে প্রেম, প্রতারণা এবং বড় অংকের অর্থের লেনদেনের বিষয়গুলো ছায়া ফেলছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বায়েজিদ এলাকায় স্থানীয়রা যখন একটি পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিতাংশ নিয়ে কুকুরকে টানাটানি করতে দেখেন, তখন মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুটি হাত ও দুটি পা উদ্ধার করে। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা তখন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে হাতের আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। সেখান থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই অঙ্গগুলো রাউজানের যুবক মো. আনিসের। এরপর তাঁর কললিস্ট বা মোবাইল ফোনের রেকর্ড যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এক নারীকে শনাক্ত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার বিকেলে বায়েজিদের অক্সিজেন শহীদনগর এলাকায় ওই নারীর বাসায় যান আনিস। পুলিশ জানায়, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং আনিসকে সেখানে সুকৌশলে ডেকে আনা হয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃত নারীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আনিস বাসায় প্রবেশের পর ওই নারী প্রথমে আনিসের মাথায় মসলা বাটার শিল বা নোড়া দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেন। এতে আনিস সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে ওই নারী তাঁর ভাই এবং আরও এক যুবকের সহায়তা নেন। তাঁরা প্রথমে গলা কেটে আনিসের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
এরপর আনিসের পেশা অর্থাৎ কসাইয়ের কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রের মতোই চাপাতি দিয়ে তাঁর শরীরকে ছয়টি টুকরো করা হয়। খুনিরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় রক্তমাখা মাংসের পিণ্ডগুলো পলিথিনে মুড়িয়ে রাতের অন্ধকারে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়ে আসে, যাতে কেউ সহজে কোনো যোগসূত্র খুঁজে না পায়। গতকাল শুক্রবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আনিসের মাথাসহ শরীরের অবশিষ্ট অংশগুলোও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কী হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে পুলিশের কাছে দুটি ভিন্নধর্মী বক্তব্য উঠে এসেছে, যা নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
প্রথমত, জিম্মি ও প্রতারণার অভিযোগ। গ্রেপ্তারকৃত নারীর দাবি, আনিসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ওই নারীর অভিযোগ, আনিসের কাছে তাঁর কিছু গোপন ছবি ও ভিডিও ছিল, যা দিয়ে আনিস তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিলেন এবং মানসিকভাবে হেনস্তা ও প্রতারণা করে আসছিলেন। এই আক্রোশ থেকেই তিনি নিজের ভাই ও স্বজনকে নিয়ে আনিসকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
দ্বিতীয়ত, পাওনা টাকার বিরোধ। অন্যদিকে নিহত আনিসের স্বজনেরা এই প্রেমের সম্পর্কের তত্ত্ব বা ছবি দিয়ে জিম্মি করার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ওই নারীর কাছে আনিস দুই লাখ টাকা পেতেন। সেই পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াতেই আনিসকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পাওনাদারকে শেষ করে দিয়ে ঋণমুক্ত হওয়ার জন্যই এই নৃশংসতার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বক্তব্য গতকাল শুক্রবার রাতে বায়েজিদ থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি একটি অত্যন্ত নৃশংস এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রেমের সম্পর্ক এবং তার পরবর্তী বিরোধের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে। তবে পাওনা টাকার বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখছি।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির জানান, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে আজ শনিবার আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। পুলিশ রিমান্ডের আবেদন জানাবে যাতে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও অন্য কেউ জড়িত আছে কি না বা ঘটনার প্রকৃত মোটিভ কী ছিল, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়।
জনমনে আতঙ্ক ও বিচার প্রত্যাশা বায়েজিদ ও অক্সিজেন শহীদনগর এলাকায় এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিনের আলোতে এভাবে ডেকে নিয়ে মানুষকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করার ঘটনা চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। নিহত আনিসের পরিবার এখন শোকে বিমূঢ়। পাওনা টাকা উদ্ধার করতে গিয়ে অথবা প্রেমের ফাঁদে পড়ে একজন যুবককে এভাবে প্রাণ দিতে হবে, তা তাঁরা ভাবতেও পারছেন না। তাঁদের একমাত্র দাবি, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন, মূল পরিকল্পনাকারী নারী, তাঁর ভাই এবং তাঁদের এক সহযোগী এখন পুলিশি হেফাজতে। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অর্থাৎ হত্যা এবং ২০১ ধারা অর্থাৎ সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আনিসের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মামলার প্রমাণাদি আরও শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া চলছে।
জেএইচআর