ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬
ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা

রাইসুল ইসলাম লিটন, টাঙ্গাইল

রাইসুল ইসলাম লিটন, টাঙ্গাইল

মার্চ ১২, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা
  • পাইকারিতে পোয়াবাড়ো খুচরা বিক্রিতে শঙ্কা
  • জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে নির্ভরতা
  • জনপ্রিয়তা পাচ্ছে থ্রিপিস-পাঞ্জাবি

বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ার মতোই টাঙ্গাইলের তাঁত এলাকাগুলোতে এখন এক অন্যরকম আনন্দের শিহরণ। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, লোকসান আর অনিশ্চয়তার চাদর সরিয়ে আবারও ‘খটখট’ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেলদুয়ারের পাথরাইল, সদর উপজেলার বাজিতপুর এবং কালিহাতীর বল্লা-রামপুর। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এই টাঙ্গাইল শাড়িতে নতুন করে হাওয়া লাগায় মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আসন্ন ঈদুল ফিতর ও বৈশাখ সামনে রেখে ঝিমিয়ে পড়া এই শিল্পে এখন কিছুটা হলেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

জানা যায়- টাঙ্গাইল শাড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের শেষভাগে। টাঙ্গাইলের বাজিতপুর, পাথরাইল, নলসন্ধা ও চন্ডী এলাকার বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের হাত ধরে এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। সিল্ক, কটন, জামদানি ও সফট সিল্কের নিপুণ কারুকাজে তৈরি এই শাড়ি এর সূ² বুনন ও বৈচিত্র্যময় পাড়ের নকশার জন্য অনন্য। মাছ, পদ্ম বা লতার মোটিফ সমৃদ্ধ এই শাড়ি ওজনে হালকা এবং পড়তে আরামদায়ক হওয়ায় যুগ যুগ ধরে এটি বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ টাঙ্গাইল শাড়ির ‘জিআই’ স্বীকৃতি দাবি করলে এক বৈশ্বিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ‘ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্প’ ইউনেস্কোর ‘অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি বাংলাদেশের একক অধিকারকে আন্তর্জাতিকভাবে সুসংহত করেছে। বৈশ্বিক স্বীকৃতি এলেও মাঠপর্যায়ে তাঁতিদের জীবন সংগ্রাম এখনও কাটেনি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্যে কিছু জটিলতার কারণে ঐতিহ্যবাহী শাড়ির রপ্তানি অনেকটা কমে গেছে- যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সুতা ও রঙের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে প্রান্তিক তাঁতিরা তাদের লাভের অংশ হারাচ্ছেন। ফলে অনেক দক্ষ কারিগর পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী তাঁতের জায়গায় স্বল্পমূল্যের ‘পাওয়ার লুম’ শাড়ির বিস্তার ঘটায় প্রকৃত হস্তশিল্পীরা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

সরেজমিনে জানাগেছে- গত কয়েক বছর ধরেই টাঙ্গাইল শাড়ির বাজার এক চরম দুঃসময় পার করছিল। সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, অন্তর্বর্তী সরকারের ভারত বিরোধিতায় বাজার হারিয়ে অনেক তাঁত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঋণগ্রস্ত হয়ে অনেক কারিগর পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো কিংবা দিনমজুরি কাজে নাম লেখাতে বাধ্য হন। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসায় বাজারে গতি ফিরতে শুরু করেছে।

তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত নানা সূত্রমতে, জেলায় তাঁতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নানা রকম তথ্য পাওয়া গেলেও অধিকাংশই অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন বেসিক সেন্টারগুলো শুধুমাত্র তাদের ঋণগ্রহীতাদের সংখ্যার ভিত্তিতে তাঁত সংখ্যা সংরক্ষণ করে থাকে। তন্তুবায় সমবায় সমিতি নিষ্ক্রিয় থাকায় তাদের কাছে হাল সময়ের তাঁত সংখ্যার সঠিক হিসাব নেই। বিসিক বা পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের কাছেও রয়েছে আংশিক বা খন্ডাংশের হিসাব। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। মাঝখানে মন্দার কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার চালু হতে শুরু করেছে।

বাতাঁবো’র কালিহাতী(বল্লা) বেসিক সেন্টারের সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৬টি প্রাথমিক ও ১টি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতির মোট তাঁত সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। এরমধ্যে এক হাজার ৬৯৫জন তাঁতির বিপরীতে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ২ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ আদায়ের হার ৮৭ শতাংশ। এছাড়া আর্থসামাজিক ও চলতি মূলধন সরবরাহ প্রকল্পের অধীনে ৬৩১জন তাঁতির মাঝে ১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। চলতি ঋণ আদায়ের হার ৭৬ শতাংশ। বাতাঁবো’র টাঙ্গাইল(বাজিতপুর) বেসিক সেন্টারে একাধিকবার গিয়েও কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দেখা পাওয়া যায়নি। অফিসে বিশালাকার তালা ঝুলতে দেখা গেছে। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বেসিক সেন্টারের কাউকে পাওয়া যায়নি।    

টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আসন্ন ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডী, নলুয়া এবং কালিহাতীর বল্লা ও রামপুর, মমিননগর, কুকরাইল, কাজিবাড়ী, দড়িখসিল্লা, কোকডহরার দত্তগ্রাম, উতরাইল এলাকা এখন অনেকটা উৎসবমুখর। তাঁতিরা দিনরাত এক করে বুনছেন জামদানি, সিল্ক, সফট সিল্ক এবং টিস্যু সিল্কের মতো আকর্ষণীয় শাড়ি। বর্তমান বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ি মানভেদে ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎসবের সময় ৫ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা মূল্যের শাড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অনলাইন ও অফলাইন উভয় মার্কেটেই টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা রয়েছে। সরাসরি হাটের পাশাপাশি বর্তমানে ই-কমার্স এবং ফেসবুক পেজের মাধ্যমে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যাপক বেচাকেনা হচ্ছে।

সূত্রমতে, ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এবছর টাঙ্গাইলে প্রায় ২৪ লাখ শাড়ির বিপরীতে ৩৫০ কোটি টাকার শাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা দামের শাড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে ভারতের জিআই ট্যাগ নিয়ে বিতর্কের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতি আবেগ ও চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ। তবে সামগ্রিকভাবে শাড়ি ব্যবহার না করায় এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বাধ্য হয়ে তাঁত মালিক বা তাঁত ফ্যাক্টরি মালিকরা হাতে বোনাতাঁত বা হ্যান্ডলুমে থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির কাপড় তৈরির দিকে ঝুঁকছে। আজকাল শাড়ির পাশাপাশি বেশিরভাগ ফ্যাক্টরিতে থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির কাপড় তৈরি করতে দেখা গেছে। 

পাথরাইল এলাকার তাঁতপল্লীতে গিয়ে দেখা যায়- এক উৎসবমুখর পরিবেশ। দিন-রাত সমান করে কাজ করছেন কারিগররা। কোনো কোনো বাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মাকু চালানোর শব্দ। তাঁতি রহমত আলী জানান, গত বছর ঈদের আগে ঘরে চাল ছিল না- বেচাকেনা না থাকা ও ‘মব’ এর ভয়ে মালিকও টাকা দিতে পারে নাই। এবার মালিক অগ্রিম টাকা দিয়েছে, দিন-রাত কাজ করছেন। তিনি শাড়ি ও থ্রি-পিসের কাপড় বুনেন। অপর তাঁতি ধীরেন পাল যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং এর ফ্যাক্টরিতে খটখট করে একটানা কাজ করছেন। তিনি জানান, ঈদ ও বৈশাখে শাড়ির চেয়ে থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি থাকে। তাই মালিকরা থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তৈরির দিকে বেশি ঝুঁকছেন। তাছাড়া টাঙ্গাইল শাড়ির তুলনায় থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তৈরিতে কারুকাজ অনেক সহজ, পরিশ্রমও কম। সে তুলনায় মজুরি বেশি। 

ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের চাহিদাকে মাথায় রেখে এবার বাজারে এসেছে বালুচরী, জামদানি, তসর, সিল্ক এবং সফট সিল্কের ওপর হাতে করা নিপুণ নকশার শাড়ি এবং নানা রঙ-বেরঙ ও কারুকাজের থ্রিপিস-পাঞ্জাবি। শাড়িতে হাতে করা এমব্রয়ডারি এবং কাঁথা স্টিচের কাজ করা টাঙ্গাইল শাড়ি এখন তরুণীদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

শাড়ি ব্যবসায়ীরা জানায়, রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা সরাসরি তাঁত সমৃদ্ধ এলাকায় আসছেন। আগে যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা মব ভায়োলেন্সের ভয়ে পাইকাররা আসতে চাইতেন না- এখন তারা নির্ভয়ে পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। তবে সুতার দাম এখনো কিছুটা চড়া থাকায় লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের মতে, সুতা ও রঙের আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিলে এবং সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা গেলে এই শিল্প হারানো গৌরব পুরোপুরি ফিরে পাবে।

কালিহাতী(বল্লা) বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার(ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তাঁত শিল্প ও এ শিল্পের বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের উদ্যোগে বস্ত্রমেলা সহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিয়মিত ক্ষুদ্রঋণ ও চলতিমূলধন হিসেবে ঋণ দিয়ে তাঁতিদের সহায়তা করার চেষ্টা করছে।

টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান, এ শিল্প বরাবরই অবহেলিত। তাঁতবোর্ডের কার্যক্রম শুধুমাত্র ঋণ দেওয়া আর আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সরকারের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু দেশের চাহিদা মেটাবে না বরং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ঐতিহ্যের সুতোয় বোনা এই শিল্পে জড়িতরা এখন কেবল বেঁচে থাকার লড়াই করছে না বরং বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নতুন স্বপ্নে বিভোর। 

এএন

Link copied!