রায়হান জামান, কিশোরগঞ্জ
মার্চ ১৭, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বাংলাদেশসহ এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ঈদের জামাতের ময়দান হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ। প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে মুখরিত হয় এই প্রাঙ্গণ। ধর্মীয় ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক ইতিহাস এবং লোককথার এক অনন্য সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এ ঈদগাহ শুধু একটি নামাজের স্থান নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামী সংস্কৃতির এক জীবন্ত নিদর্শন।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, বহু বছর আগে এখানে একসঙ্গে সোয়া লাখ (এক লাখ পঁচিশ হাজার) মুসল্লির ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেই “সোয়ালাখিয়া” শব্দ থেকেই সময়ের বিবর্তনে “শোলাকিয়া” নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। যদিও এ তথ্যের সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রমাণ সীমিত, তবুও এটি স্থানীয় ইতিহাস ও জনবিশ্বাসে গভীরভাবে প্রোথিত।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭শ শতাব্দীর শেষার্ধে আধ্যাত্মিক সাধক ও ইসলাম প্রচারক সৈয়দ আহাম্মদ কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বর্তমান শোলাকিয়া এলাকায় আগমন করেন। সে সময় এলাকাটি ‘রাজাবাড়ীয়া’ নামে পরিচিত ছিল এবং ছিল ঘন জঙ্গল ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও তিনি সেখানে অবস্থান করে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে তিনি একটি আস্তানা স্থাপন করেন। লোককথায় আছে, এক রাতে ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও তার কুঁড়েঘর অক্ষত থাকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার আধ্যাত্মিক প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানুষ তার অনুসারী হন এবং ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে।
সে সময়ের প্রভাবশালী শাসক ঈসা খাঁ-এর বংশধর জঙ্গলবাড়ী ও হয়বতনগরের জমিদাররা তার কার্যক্রমে সহায়তা করেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি জমির মালিকানা লাভ করেন এবং সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রম বিস্তৃত করেন। ধারণা করা হয়, বর্তমান শোলাকিয়া সাহেববাড়ি জামে মসজিদ তারই প্রতিষ্ঠিত।
১৮২৮ সালে তিনি নিজ মালিকানাধীন জমিতে ঈদের জামাতের জন্য একটি ময়দান প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথমবারের মতো সেখানে ঈদের জামাতের ইমামতি করেন। জামাত শেষে তিনি মুনাজাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেন, এই মাঠে যেন ভবিষ্যতে সোয়া লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে। সেই দোয়ার সূত্র ধরেই “শোলাকিয়া” নামের উৎপত্তি বলে অনেকের ধারণা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ময়দানের পরিধিও বাড়ানো হয়। হয়বতনগরের জমিদার ঈদগাহ-সংলগ্ন জমি ওয়াকফ করে দেন। পরবর্তীতে ব্যক্তি উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদগাহের পরিসর আরও সম্প্রসারিত হয়।
বর্তমানে শোলাকিয়া ঈদগাহ শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঐতিহ্যবাহী আয়োজন এবং বিপুল সংখ্যক মুসল্লির অংশগ্রহণের কারণে এটি একটি অনন্য ধর্মীয় মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম তুষার বলেন, “শোলাকিয়া ঈদগাহ আমাদের কিশোরগঞ্জের গর্ব। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদের দিন এখানে মানুষের ঢল নামে। শুধু নামাজ নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ।”
মাঠের নিয়মিত মুসল্লি আবুল কামাল আজাদ বলেন, “শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়া সত্যিই ভিন্ন এক অনুভূতি। লাখো মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায় করা আত্মিকভাবে অনেক প্রশান্তি দেয়। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাও এখানে প্রশংসনীয়।”
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য ও আস্থার ধারক এই শোলাকিয়া ঈদগাহ আজও প্রমাণ করে—একজন আধ্যাত্মিক সাধকের দোয়া ও মানুষের বিশ্বাস মিলেই গড়ে উঠতে পারে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ।
এএন