নুরুজ্জামান শেখ, শরীয়তপুর
মার্চ ২৯, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম
শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলায় ডিজেলের চরম সংকট দেখা দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন নৌযান শ্রমিক, মাছ ধরার ট্রলার এবং ডিজেল চালিত যানবাহনের শ্রমিকরা। পাশাপাশি ইরি-বোরো ধান চাষও ব্যাহত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ডিজেল বিক্রি করেন।
তবে কয়েক দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছেন না। এ সুযোগে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নৌযান শ্রমিক, সেচ পাম্প চালক ও জেলেরা। তেল না পেয়ে পাম্প ঘেরাও করে কৃষকরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
জাজিরার নাওডোবা থেকে গোসাইরহাট উপজেলার নলমুরি পর্যন্ত প্রায় ৭১ কিলোমিটার নদী পথে প্রায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। আগে বৈঠা চালিত নৌকা ব্যবহার হলেও এখন অধিকাংশ নৌকাতেই ইঞ্জিন বসানো হয়েছে। জেলায় অন্তত ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। এসব নৌকা চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
এদিকে ডিজেল সংকটের কারণে শরীয়তপুরের ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়। লক্ষ্যমাত্রা ২৫ হাজার ৫শ হেক্টর। জেলায় ডিজেল চালিত সেচ মেশিনের সংখ্যা ২ হাজার ৫শ ২টি। ডিজেল সংকটের কারণে ক্ষেতে যথাযথ সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে ধানের ক্ষেত। এতে চাষের উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল শনিবার রাতে তেল না পেয়ে শরীয়তপুর শহরের মনোহর বাজার এলাকার হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় কৃষকরা। পরে তারা পাম্প ঘেরাও করে রাখেন। উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কৃষকদের সামান্য কিছু তেল সরবরাহ করা হলে তারা পাম্প ছেড়ে চলে যান।
নড়িয়া উপজেলা সুরেশ্বর এলাকার জেলে আসমত আলী বলেন, নদী তীরবর্তী হাটবাজারগুলোতে ডিজেলের সংকটের কারণে আমাদের নৌকা চলছে না। আবার কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে নদীতে যাচ্ছেন। তাঁদের লিটার প্রতি ডিজেল দিতে হচ্ছে ৬০–৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘অভাবের সংসারে ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নদীতে নামি। এত বছরে ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এখন সেই ইঞ্জিনই বিপদের কারণ হয়েছে। বাজারে তেল পাচ্ছি না, তাই সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার ও শ্রমিকদের নিয়ে বিপাকে আছি। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি।’
গোসাইরহাট উপজেলার গরিবেরচর এলাকার কৃষক আমির হোসেন, জয়নাল বেপারী, মিয়া চান বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় কোথাও তেল না পেয়ে শরীয়তপুর জেলা শহরের মনোহর বাজারের হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনে টানা চার দিন তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর শুনতে পাই সেখানে তেল বিক্রি হচ্ছে। ২ শতাধিক কৃষক সেখানে তেল আনতে গিয়েছিল। তেল না দেওয়ার কারণে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কিছু তেল পাই। আমরা আমাদের ইরি-বোরো ফসল নিয়ে চরম শঙ্কায় আছি।’
জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ফকির কান্দি এলাকার হারেজ মাদবর বলেন, ‘সুরেশ্বর বাজারে দুই লিটার করে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। তা–ও প্রতি লিটার ১৭০ টাকা। এই তেল দিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা মাছ ধরা যায়। কোনো দিন মাছ পাই, কোনো দিন পাই না। বাধ্য হয়েই আমাদের অন্য পেশায় যেতে হবে।’
চাঁদপুরের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপো থেকে তেল এনে বিক্রি করেন সুরেশ্বর বাজারের ব্যবসায়ী সোলায়মান হোসেন। তিনি জানান, প্রতিদিন দোকানে তিন-চার হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না। এ কারণে নৌযান ও জেলেদের ডিজেল দিতে পারছি না। বেশি দামে বিক্রির অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি তাঁর।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাফিজ এলাহী বলেন, পাম্পে কৃষকরা বিক্ষোভ করেছে। এমন খবর পেয়ে গতকাল রাতে সেখানে যাই। পরে প্রত্যেককে ৫ লিটার করে ডিজেল দেওয়ায় কৃষকরা শান্ত হয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি ইরি-বোরো ধান চাষ হয়েছে। তেল সংকটের কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, ঈদের আগ পর্যন্ত নৌযান ও জেলেদের জ্বালানি তেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের পর নদী তীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জেলেরা কিছু কিছু স্থানে জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অচিরেই সংকট কেটে যাবে।
এএন