বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির এক নতুন ও উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। এবার প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে উত্তর খোঁজার সময় হাতেনাতে এক পরীক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শুক্রবার সকালে বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘সি’ ইউনিটের প্রথম পালার পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল জালিয়াতির এ ঘটনায় শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ১১টায় ‘সি’ ইউনিটের প্রথম শিফটের পরীক্ষা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগদীশ চন্দ্র বসু একাডেমিক ভবনের ১০২ নম্বর কক্ষে পরীক্ষা চলাকালীন এক পরীক্ষার্থীর অস্বাভাবিক গতিবিধি নজরে আসে দায়িত্বরত কক্ষ পরিদর্শকের। পরীক্ষার্থী দিব্য জ্যোতি সাহা খাতায় উত্তর করার চেয়ে বারবার নিজের পোশাকের ভেতরে এবং টেবিলের নিচে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছিলেন। সন্দেহ হওয়ায় শিক্ষক তার কাছে এগিয়ে যান এবং তল্লাশি চালান। তল্লাশিকালে তার কাছে একটি অত্যাধুনিক স্মার্টফোন এবং ক্ষুদ্রাকৃতির এয়ারপড পাওয়া যায়।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওই শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান বের করার চেষ্টা করছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আটক পরীক্ষার্থীর নাম দিব্য জ্যোতি সাহা। তিনি খুলনার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও বর্তমানে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বসবাস করেন। প্রক্টর দপ্তরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তিনি পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন, তবে উত্তরপত্রে কিছু লেখার আগেই ধরা পড়ে যান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর গিয়াসউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ওই শিক্ষার্থী কৌশলে মুঠোফোন ও এয়ারপড নিয়ে প্রবেশ করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক তদন্তে তার ফোন থেকে প্রশ্নপত্রের ছবি তোলার অকাট্য আলামত পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, আটক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো উন্নত প্রযুক্তি ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতে ব্যবহারের ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম। ডিজিটাল এ অপতৎপরতা রুখতে আইসিটি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভর্তি পরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের এ ঘটনা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন এক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগের বছরগুলোতে কানে ইয়ারফোন বা ডিভাইস ব্যবহার করে বাইরে থেকে উত্তর শুনে লেখার প্রবণতা থাকলেও, এবার সরাসরি ফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার বিষয়টি উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয় আইসিটি সেন্টারের একজন বিশেষজ্ঞ জানান, বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুলগুলো যেকোনো লিখিত প্রশ্নের ছবি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নির্ভুল সমাধান দিতে সক্ষম। তাই পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে মেটাল ডিটেক্টর এবং জ্যামার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।
উল্লেখ্য, এ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বারের মতো তাদের ভর্তি পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর ও বরিশাল, এ পাঁচটি বিভাগীয় শহরে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে একযোগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত কষ্ট ও অর্থ সাশ্রয় করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, পরীক্ষাকেন্দ্রে কোনো ধরনের ব্যাগ, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ঘড়ি, ব্লুটুথ ডিভাইস বা হেডফোন বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ নির্দেশনা অমান্য করলে পরীক্ষা বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। দিব্য জ্যোতি সাহার এ আটক হওয়ার ঘটনা অন্য পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিকেল নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে আটক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি চেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী শিফটগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ইএইচ