আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটে ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে সংঘর্ষ, ধাক্কাধাক্কি এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে একাধিক স্থানে ইভিএম বিভ্রাটের কারণে ভোট গ্রহণ ব্যাহত হয়েছে বলে জানা যায়। এতে ভোটারদের মধ্যে ভোগান্তি ও উদ্বেগ দেখা দেয় এবং অনেক কেন্দ্রেই দীর্ঘ সময় ভোটগ্রহণ স্থগিত বা ধীরগতিতে চলতে থাকে।
বুধবার ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অশান্তির খবর আসতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে "সন্ত্রাস" সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন, অন্যদিকে বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ এনেছে।
নিচে এই নির্বাচনী পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ের ভোটগ্রহণ চলাকালীন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও অরাজকতার খবর পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় দফার এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR)-এর প্রেক্ষাপটে, যার মাধ্যমে রাজ্য থেকে প্রায় ৯০.৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, এটি বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।
ভোটগ্রহণের শুরুতেই নদীয়া জেলার ‘চপড়া‘উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে মোশাররফ মীর নামক এক বিজেপি এজেন্টকে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা রড দিয়ে মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিজেপির দাবি, আক্রমণকারীদের একজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। পুলিশ এই ঘটনায় মামলা দায়ের করেছে, যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে আইএসএফ (ISF) এজেন্টকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া শান্তিপুরে বিজেপির নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা হয়েছে। এন্টালি কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল পোলিং অফিসার এবং নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, বুথ ছোট হওয়ার অজুহাতে বিজেপি এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে যাতে তৃণমূল জালিয়াতি করতে পারে।
হাওড়া জেলার বেশ কিছু বুথে ইভিএম বিকল হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে এক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, অনেক বুথে ইভিএম মেশিনে বিজেপির প্রতীকের ওপর টেপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ভোটাররা পদ্ম ফুলে ভোট দিতে না পারেন। মালব্য একে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল'হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং আক্রান্ত বুথগুলোতে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ভোট চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে এবং সাধারণ ভোটারদের ওপর সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আমাদের লোকদের টার্গেট করছে। এভাবে ভোট হতে পারে না। বাইরে থেকে পর্যবেক্ষক নিয়ে এসে বিজেপি যা বলছে তাই করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী নয়, ভোট দেবে জনগণ। ওরা সন্ত্রাসবাদ চালাচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও‘কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের বিরুদ্ধে তাঁদের এক্তিয়ার বহির্ভূত কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর এই মন্তব্য করেন।
দ্বিতীয় দফার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো দক্ষিণ কলকাতার ‘ভবানীপুর‘আসন। এখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাঁর এক সময়কার ঘনিষ্ঠ অনুগামী এবং বর্তমানে বিজেপির হেভিওয়েট নেতা ‘শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্রটি তৃণমূলের দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এবারের লড়াই অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়া। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভুয়া এবং মৃত ভোটারদের সরাতেই এই 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' করা হয়েছে। তবে তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপির সুবিধার জন্য ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার নির্বাচনে ৯২.৮৮ শতাংশ রেকর্ড ভোট পড়েছিল।
ইভিএম টেম্পারিং, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি-সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা। বিজেপির দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রার্থী বিকাশ সরদারের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং একাধিক দলীয় কর্মী আহত হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে প্রশাসনিক রদবদল এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি, অন্যদিকে তৃণমূলের রাজপথের লড়াই, সব মিলিয়ে আজ বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর সন্ত্রাস বনাম বিজেপির ‘ভোট লুটের’ পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাঝে সাধারণ মানুষের রায় শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা জানতে আগামী ৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সহিংসতার ছায়ায় ঢাকা এই দ্বিতীয় দফার নির্বাচন বাংলার গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এএন