বিশেষ প্রতিবেদক
জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
আশির দশকের শেষভাগ। বাংলাদেশে তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। সেই সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার এক তরুণ ও তেজস্বী সাংবাদিক হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন আজকের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। দীর্ঘ ৩৬ থেকে ৩৭ বছর আগের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি, যা রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
আসিফ নজরুল তার স্মৃতিচারণে লেখেন, ১৯৮৮ বা ৮৯ সালের দিকে বিএনপির তৎকালীন ধানমন্ডি কার্যালয়ে তিনি খালেদা জিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময়ে বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রখর। লম্বালম্বি একটি ঘরের বড় টেবিলের ওপাশে বসেছিলেন ম্যাডাম। পাশে ছিলেন তৎকালীন ছাত্রদল সভাপতি আসাদুজ্জামান রিপন এবং ঘরের অন্য প্রান্তে বসা ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন একটি ঘটনার উল্লেখ করে আসিফ নজরুল জানান, লিখিত প্রশ্নের উত্তরগুলো তার কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল না। তাই আলোচনা প্রাণবন্ত করতে তিনি হুট করে বেগম জিয়াকে একটি অত্যন্ত চোখা বা তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে বসেন। প্রশ্ন শুনে কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
তরুণ আসিফ নজরুলের সেই প্রশ্নে তৎকালীন বিএনপি নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে বলেন, এটা কী ধরনের প্রশ্ন করলেন! সেদিনের সেই রাগী তরুণ আসিফ নজরুলও দমে যাননি। তিনি পাল্টা জবাবে সাইফুর রহমানকে বলেছিলেন, আপনি কথা বলছেন কেন? আমি তো আপনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার উপক্রম হলে স্বয়ং খালেদা জিয়াই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি সাইফুর রহমানকে থামিয়ে দিয়ে অত্যন্ত হাসিমুখে আসিফ নজরুলের সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেন। এই ঘটনাটি আসিফ নজরুলের মনে বেগম জিয়ার উদারতা ও পেশাদারিত্ব সম্পর্কে এক গভীর ছাপ ফেলেছিল।
ডক্টর অব ফিলোসফি বা পিএইচডি শেষ করে দেশে ফেরার পর আসিফ নজরুল যখন কলাম লেখক ও আলোচনা অনুষ্ঠান বা টকশো ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, ততদিনে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার ওপর শুরু হওয়া মিথ্যা মামলা ও হয়রানির সময়েও আসিফ নজরুল তার লেখনীর মাধ্যমে সরব ছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলের দীর্ঘ ১৫ বছরে তিনি কখনো খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থন প্রকাশে পিছপা হননি। তার মতে, মির্জা ফখরুল আলমগীর ছাড়া বিএনপির বাইরে আর কাউকেই ম্যাডামের পক্ষে এতোটা সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।
বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ের দিনটিকে নিজের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন আসিফ নজরুল। তিনি জানান, ম্যাডামকে বিদায় জানানোর সময় প্রায় পুরোটা সময় তিনি তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের কাছাকাছি ছিলেন। সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল যখন তিনি খালেদা জিয়ার কফিনে জড়িয়ে রাখা জাতীয় পতাকাটি তার উত্তরসূরির হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পান।
আসিফ নজরুল লিখেছেন, এই পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য তিনি কমা খালেদা জিয়া কমা সারাজীবন বহু বঞ্চনা আর দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছেন। এই পতাকা উনার সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সৌভাগ্যও হলো আমারই।
ডক্টর আসিফ নজরুলের এই স্মৃতিচারণ কেবল একজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়ের সাক্ষী। ১৯৮৮ থেকে ৮৯ সালের সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিকের স্মৃতি এবং সাইফুর রহমানের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার ধৈর্য ও হাসিমুখে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে শুরু করে গত ১৫ বছরে খালেদা জিয়ার ওপর চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আসিফ নজরুলের অবস্থান এবং খালেদা জিয়ার কফিনের পতাকা পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে একজন কঠোর সমালোচক ও সাংবাদিক থেকে কীভাবে তিনি বেগম জিয়ার আদর্শ ও সাহসিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলেন, তার এই পোস্টটি সেই বিবর্তনেরই একটি প্রামাণ্য দলিল।
জেএইচআর