আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ চার বছরের নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর অবশেষে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর’ বিষয়ক একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান এবং জাপানের পক্ষে দেশটির রাষ্ট্রদূত সাইডা শিনিচি নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী কেবল আধুনিক সরঞ্জামই পাবে না, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ গবেষণার এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে।
তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এমন সংবেদনশীল চুক্তির ‘সময় নির্ধারণ’ বা টাইমিং এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। জাপানের সঙ্গে এই বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর সূত্রপাত হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত টোকিও সফরকে কেন্দ্র করে।
যদিও সেই সফর স্থগিত হয়েছিল, কিন্তু আলোচনার চাকা থামেনি। ২০২২ সালে মিৎসুবিশি ইলেকট্রনিকসের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে রাডার প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনা করে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘সম্মতিপত্র’ বা লেটার অফ ইনটেন্ট সই হয়, যা ছিল বর্তমান চুক্তির ভিত্তি।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে বৈঠকে এই চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পায়। জাপানের কঠোর প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতি অনুসরণ করে এই চুক্তিতে প্রধানত তিনটি স্তম্ভ রয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ জাপান থেকে উন্নত প্রযুক্তির নৌ-টহলযান, আকাশপথের নজরদারি ব্যবস্থা বা রাডার এবং অপ্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে।
এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা, উপকূলীয় নজরদারি এবং কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নে অংশ নেবে। চুক্তির একটি অন্যতম শর্ত হলো, জাপান থেকে প্রাপ্ত প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম তৃতীয় কোনো দেশে হস্তান্তর করা যাবে না এবং এর ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
জাপানের সঙ্গে এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো যখন বাংলাদেশ বিশ্বশক্তির এক ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সমরাস্ত্রের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি চীনে চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের সমঝোতা বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার গভীর সামরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
এখন কোয়াড বা চতুর্ভুজ নিরাপত্তা সংলাপের সদস্য জাপানের সঙ্গে এই চুক্তি বেইজিংয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেটি দেখার বিষয়। অন্যদিকে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে ড্রোন প্রকল্পের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে জাপানের সঙ্গে চুক্তিটি ঢাকাকে পশ্চিমা জোটের কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও এর সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে অন্তর্বর্তী সরকারের এমন একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তি সই করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের চুক্তি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে এই সিদ্ধান্তটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হলে তা অধিকতর গণতান্ত্রিক ও কৌশলগতভাবে নিরাপদ হতো বলে অনেকে মনে করেন। তবে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআরের দাবি, এটি সরকারের ‘দূরদর্শী ও কার্যকর কূটনীতির’ ফসল।
জাপান সাধারণত খুব কম দেশের সঙ্গেই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়ের চুক্তি করে। ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রথম চুক্তি করার পর এই তালিকায় ১২তম দেশ হিসেবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। এশিয়ার মধ্যে ভারত, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও মঙ্গোলিয়ার মতো দেশগুলো এই তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ১২টি দেশের সঙ্গে ২০টি প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আ ন ম মুনীরুজ্জামান এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়বে এবং আধুনিক প্রযুক্তির পথ সুগম হবে। যেহেতু এখানে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক জোটে জড়ানোর শর্ত নেই, তাই এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য সহায়ক।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতি এখন এক কঠিন পরীক্ষা দিচ্ছে। একদিকে চীনের কারিগরি সহায়তা, অন্যদিকে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, এই দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। জাপানের সঙ্গে এই চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি অনুসরণ করে করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে পুনর্ব্যক্ত করে।
এটি কেবল সমরাস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও জাপানের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ বা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গভীর করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এখন দেখার বিষয়, এই প্রযুক্তির সুফল কত দ্রুত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী গ্রহণ করতে পারে এবং এই নতুন মৈত্রী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী ভূমিকা রাখে।
জেএইচআর