জাহিন হাসান রাহাত
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং বছরের পর বছর ধরে জেঁকে বসা দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজত্ব চিরতরে অবসানের ঘোষণা দিয়েছেন নবনিযুক্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
শুক্রবার দুপুরে নিজ জেলা নরসিংদীর মনোহরদীতে স্থানীয় সুধীজন ও প্রশাসনের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই নতুন পথনকশা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের অধীনে সাধারণ মানুষকে আর চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না, বরং রাষ্ট্রই সেবার ঝুলি নিয়ে পৌঁছে যাবে সাধারণ মানুষের আঙিনায়।
স্বাস্থ্যখাতে ওষুধ সরবরাহ, কেনাকাটা এবং বদলি, পদায়নকে কেন্দ্র করে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা ভাঙাকেই নিজের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে আমরা সম্পূর্ণ সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিমুক্ত করব। এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সরকারি সেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও যোগ করেন, চিকিৎসা সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি ব্যতিক্রমী দর্শনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মানুষকে আর ডাক্তারের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না, বরং ডাক্তারই মানুষের প্রয়োজনে তাদের পেছনে ঘুরবে। আমরা চিকিৎসা সেবাকে এমনভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই যাতে গ্রামের প্রান্তিক মানুষটিও ঘরের কাছে মানসম্মত সেবা পায়। সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সেবার মান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বকুল তাঁর উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল মানুষকে নিয়ে আমরা একটি সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই। যারা আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাদের প্রতি আমাদের যেমন দায়িত্ব আছে, যারা ভোট দেননি তাদের প্রতিও আমাদের সমান দায়বদ্ধতা রয়েছে।
তিনি কঠোরভাবে ঘোষণা করেন যে, কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ এই সরকারে নেই। প্রতিটি নাগরিক, সে যে দলেরই হোক না কেন, সমান চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন এবং সরকার তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
নিজ জেলা নরসিংদীর স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা দূর করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, জটিল রোগীদের তাৎক্ষণিক সেবার জন্য নরসিংদীতে দুটি অত্যাধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় রোগীদের আর ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে ছুটতে হবে না।
এছাড়া মন্ত্রী জানান, সারা দেশে যেখানেই প্রয়োজন দেখা দেবে, সেখানেই নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। নরসিংদীসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোতে বিশেষায়িত চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিন্ডিকেট নির্মূল ও জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেছেন। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা তাঁর লক্ষ্য।
এছাড়া নরসিংদীতে দুটি নতুন আইসিইউ ইউনিট স্থাপন এবং প্রতিহিংসা পরিহার করে দল, মত নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সেবা নিশ্চিত করার রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। সেবার মান বাড়িয়ে ডাক্তারদের আরও বেশি জনমুখী করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের এই বক্তব্য মূলত তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিরই অংশ। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের একটি বড় অংশ দুর্নীতির কারণে অপচয় হওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী বকুল তা দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বিশেষ করে ভোট দিলেও সেবা পাবেন, না দিলেও পাবেন এই মন্তব্যটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ওষুধ চুরির মতো প্রাচীন সমস্যাগুলো সমাধান করাই হবে তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।
নরসিংদীর মনোহরদীতে মন্ত্রীর এই মতবিনিময় সভায় স্থানীয় নেতা, কর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। মন্ত্রীর এই সুনির্দিষ্ট ও জনমুখী পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের জঞ্জাল পরিষ্কার করে স্বাস্থ্যখাতকে তিনি কতটা স্বচ্ছ ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
জেএইচআর