নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপণন সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এখন থেকে সরকারি ডিপোগুলো থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই তেল খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে।
শনিবার বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, এখন থেকে দেশের প্রধান জ্বালানি স্থাপনা ও ডিপোগুলো থেকে তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৭টায় এবং শেষ হবে বিকেল ৩টায়।
এর আগে ডিলার ও পাম্প মালিকরা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তেল সংগ্রহ করতে পারতেন। অর্থাৎ, সরবরাহ কার্যক্রম দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, দিনের শুরুর দিকেই তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে পরিবহন ও খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কম থাকবে।
বিপিসি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই সংকট যেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে না পারে, সেজন্যই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
১. নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা: দেশের ফিলিং স্টেশন, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার এবং পাম্পগুলোতে যেন তেলের ঘাটতি না হয়, সেজন্যই ডিপো থেকে দ্রুত তেল ছাড় করার এই পরিকল্পনা।
২. পরিবহন জট এড়ানো: দিনের শুরুতে তেল সরবরাহ শুরু হলে ট্যাংকলরিগুলো যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
৩. মজুতদারি রোধ: সঠিক সময়ে পাম্পে তেল পৌঁছালে অসাধু ব্যবসায়ীরা 'তেল নেই' বলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ পাবে না।
জ্বালানি তেলের সঠিক বণ্টন এবং কালোবাজারি রুখতে সরকার আরও একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে তেলের মজুত ও বিক্রি পর্যবেক্ষণের জন্য 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ দেওয়া হবে। এই কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে তেলের ইনভেন্টরি যাচাই করবেন, যাতে কোনো পাম্প মালিক অবৈধভাবে তেল মজুত করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় তেলের অবৈধ মজুত এবং কৃত্রিম সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ময়মনসিংহের মুদিদোকানি থেকে শুরু করে কুড়িগ্রামের গোয়ালঘর সর্বত্রই তেলের ড্রাম জব্দের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপিসির এই সময়সূচি পরিবর্তন একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানা বিজ্ঞপ্তিতে আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সকল কোম্পানিকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
নতুন সময়সূচি নিয়ে ডিলারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে সকালে দ্রুত কাজ শুরু করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে বিকেল ৩টার মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার ফলে শেষ মুহূর্তের চাহিদা পূরণে কোনো সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জ্বালানি তেলের বিপণন সময় পরিবর্তন সরকারের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের আঁচ যেন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দগ্ধ করতে না পারে, সেজন্য সরবরাহ চেইনকে গতিশীল রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এই নতুন শিডিউল যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ট্যাগ অফিসারদের কঠোর নজরদারি এবং ডিপো থেকে সময়মতো তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো কঠিন।
এএন