Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

জাতীয় উন্নয়নে ”সামাজিক জবাবদিহিতা” এখন সময়ের দাবী!

মো. তানজিমুল ইসলাম

মো. তানজিমুল ইসলাম

মে ১৬, ২০২২, ১১:৩৭ এএম


জাতীয় উন্নয়নে ”সামাজিক জবাবদিহিতা” এখন সময়ের দাবী!

জনসংখ্যা বহুল এদেশের উন্নয়নের তালিকাটি একেবোরেই ছোট্ট নয়। তবু কেন জানি আমজনতার মনে অনিবার‌্য কারণে চাপা কান্না পরিলক্ষিত হয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে অস্ফুট কষ্ট দেখার জন্য কেউ কি নেই? অনেকে মনে করছেন “যেহেতু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে, তাই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কোন সমস্যা নয়। 

আসলেই কি তাই? কত শতাংশ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে আর কত শতাংশ মানুষ আড়ালে-আবডালে বর্ণনাতীত কষ্টে দিনাতিপাত করছে তার হিসেব কে রাখে? হয়তো অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এদেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; তাইতো গত বছর ছিলো পিঁয়াজের ঝাঁঝালো প্রভাব! 

সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুও চরমভাবে এদেশকে প্রভাবিত করেছে! রান্নার তেলসহ জ্বালানী কাজে ব্যবহৃত তেল, চিনি, ডিম, মাছ, মাংস, সবজী, ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়লেই কি কারো এসে যায়? 

আমজনতা হিসেবে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহুর্ত খুব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি! আমাদের তো আর ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি! বেড়েছে দিনে দিনে সরকারেকে কর প্রদানের হার। সকল সম্ভাবনার এদেশে চাইলেই অনেক কিছু সম্ভব। ইচ্ছে করলেই দু’মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি মাংসের দাম দু’শত (২০০) টাকা  বাড়ানো সম্ভব! 

কালবৈশাখী ঝড়ের মতো দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি যেন জনগণকে জীবন্ত লাশে পরিণত করেছে। কি হচ্ছে এসব? কেন ঘটছে এসব অনাকাঙ্ঘিত ঘটনাসমূহ? এজন্য কি শুধু সরকার একাই দায়ী? আপনি, আমি কি এতটুকু দায়ী নই? নাকি কেবল দায় এড়িয়ে চলার পথ খুঁজি মাত্র? কেউ কি এসব থেকে উত্তরণের কোন স্বপ্ন দেখি কখনো? 

অনেক দামে কেনা এদেশের স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সাথে এক হয়ে আমাদের সর্বাগ্রে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে স্বেচ্ছায়। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, জাতীয় উন্নয়নের জন্য ”সামাজিক জবাবদিহিতা” এখন সময়ের দাবী। 

তাহলে কিভাবে আমরা এগুতে পারি? আসুন তবে এমনি একটি বাস্তব ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিই।

ভৌগলিক অবস্থান ও পরিবেশগত কারণে উত্তর জনপদের মানুষ অনেকটাই সরল প্রকৃতির। রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থাও ঠিক তেমনি নাজুক। পর‌্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষের অভাব ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের তেমন কোন সুযোগ ছিলোনা। 

ইতোমধ্যে গ্রামবাসবাসীদের মধ্যে দু’একজন প্রবীন সমাজসেবীর মধ্যে শিশুদের কল্যাণে কাজ করার তাড়না বোধ সৃষ্টি হয়। বছরের পরে বছর পেরিয়ে যায়, ডাঙ্গাপাড়াবাসী অপেক্ষায় থাকে এই বুঝি বিদ্যালয় উন্নয়নের পথ সুগম হলো, শিশু কল্যাণের জন্য নাগরিক সমাজ জেগে উঠবে! কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে বালি! অজানা কোন কারণে সেটি আর আলোর মুখ দেখছিল না। 

ডাঙ্গাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার অন্তর্গত। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা-”ওয়ার্ল্ড ভিশন”এর এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্ম এলাকা। আদিবাসীসহ পিছিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের বসবাস এ অঞ্চলে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো অনেকাংশে অধিকার বঞ্চিতও বটে! শিশু উন্নয়নে ভুমিকা রাখার বদৌলতে ”স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি সহ এলাকার সাধারণ জনগণ” ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রতি শিশুর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শরণাপন্ন হয়। 

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় ওয়ার্ল্ড ভিশন“সিটিজেন ভয়েস এন্ড এ্যাকশন (সিভিএ)” নামক এপ্রোচের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগী জনগণকে সম্পৃক্ত করে। ”সিভিএ” অথবা ’সামাজিক জবাবদিহিতা’ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ্যাপ্রোচ; যার মাধ্যমে সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারী উভয়পক্ষকে একই প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করা যায়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সেবাগ্রহীতার জন্য বরাদ্দকৃত সেবা নিশ্চিত করতে সেবাগ্রহীতা সহ স্থানীয় জনগণ এতে অংশগ্রহন করে। সিভিএ  ওয়ার্কিং গ্রুপকে মৌলিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাধারন সভায় তাঁদের সমস্যার ইস্যু নির্ধারণ করে। ধাপে ধাপে সরকারি পরিষেবা সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা পায়। 

এমনি করেই সিভিএ ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যবৃন্দ অতি সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছায়; সরকারি পরিষেবা নিশ্চিতকরণের জন্য নির্ধারিত মনিটরিং স্ট্যান্ডার্ডসমূহের মাধ্যমে তাঁদের সন্তুষ্টির মান যাচাই করেন। পরবর্তীতে সিভিএ ওয়ার্কিং গ্রুপের আয়োজনে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহি অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, অভিভাবকবৃন্দ, শিক্ষক বৃন্দ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় সাধারণ জনগণ, ছাত্রছাত্রীবৃন্দ সাধারন মানুষের মুখোমুখি হন। 

ন্যায্যতার ভিত্তিতে সিভিএ ওয়ার্কিং গ্রুপ উক্ত ইন্টারফেইস মিটিংএ ‘শ্রেণীকক্ষের অপ্রতুলতা, সীমানা প্রাচীর না থাকা ও পয়নিষ্কাশন ব্যববস্থার সীমাবদ্ধতাসহ খেলাধূলার সামগ্রীর অপ্রতুলতা সম্পর্কে তুলে ধরেন। পুরো প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওয়ার্ল্ড ভিশন লাইব্রেরীতে শিশুদের মানসিক বিকাশ সাধনে শিক্ষামূলক বই প্রদান করে। 

এছাড়া, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, এসএমসি’র সভাপতি কর্তৃক ইতোমধ্যে পর‌্যাপ্ত বেঞ্চ, ফ্যান, খেলাধূলার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। এখানেই থেমে থাকেনি উন্নয়নের জয়রথ! সবশেষে, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, প্রধান শিক্ষক ও এসএমসি’র নিরলস প্রচেষ্টায় সরকার কর্তৃক প্রায় ৮৫০০০০/-(পঁচাশি লক্ষ টাকা) স্কুল উন্নয়ন তথা ভবন নির্মাণার্থে অনুদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। 

ইতোমধ্যে দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে কাজটি শুরুর জন্য বিভিন্ন নির্মান প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে অতি শীঘ্রই ডাঙ্গাপাড়া’র মতো অজপাড়া গাাঁয়ে নতুন করে আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে পড়বে। 

আগামী দিনের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সেদিন নিশ্চয়ই অনুকুল পরিবেশে বেড়ে উঠবে! তবেই সার্থক হবে আজকের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ! শিশুর কল্যাণার্থে অগ্রণী ভুমিকা রাখা উন্নয়ন সংস্থা ”ওয়ার্ল্ড ভিশনের” ”সিভিএ” এ্যাপ্রোচও হয়তো শীঘ্রই খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। 

সেদিন হয়তো আর দূরে নয়। এমনি করেই সামাজিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে রাজশাহী জেলার তানোরের ডাঙ্গাপাড়ার মতো প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে নতুন ও সুন্দর দিনের। এমনি করে চলমান অনাকাঙ্ঘিত ঘটনা নিয়ে আমরা একত্রিত হতে পারি ভিন্ন কোন বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে! ”সিভিএ (সিটিজেন ভয়েজ এন্ড এ্যাকশন)“ অথবা “সামাজিক জবাবদিহিতা”র মতো গুরুত্বপূর্ণ কোন এ্যাপ্রোচের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতা ও সেবাপ্রদানকারী মহলকে বিনিড়ভাবে সংবেদনশীল করতে পারি। আসুন, তাঁর আগে নিজেরাই সংবেদনশীল হই। সার্বিক বিবেচনায় সত্যিই, জাতীয় উন্নয়নের জন্য ”সামাজিক জবাবদিহিতা” যেন এখন সময়ের দাবী মাত্র!

লেখক:মো: তানজিমুল ইসলাম, লেখক, কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী।