গাজী তৌহিদুল ইসলাম
নভেম্বর ১৩, ২০২৫, ০২:৩৪ পিএম
প্রাচীন যুগে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা বিশ্বাস করত যে চাঁদ নিজেই আলো বিকিরণ করে। মিশরীয়রা প্রায় ৩০০০–৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে চাঁদকে “থথ” বা “খনসু” দেবতা হিসেবে পূজা করত এবং মনে করত তিনি নিজে আকাশে আলো ছড়ান। বাবিলনীয়রা প্রায় ২০০০–৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে “সিন” নামের চন্দ্রদেবতাকে আলোর উৎস বলে বিশ্বাস করত।
গ্রিক সভ্যতার প্রাথমিক যুগেও একই ধারণা প্রচলিত ছিল, যদিও প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা, আনাক্সাগোরাস পঞ্চম শতক খ্রিষ্টপূর্বে, অ্যারিস্টটল চতুর্থ শতক খ্রিষ্টপূর্বে এবং পটলেমি দ্বিতীয় শতক খ্রিষ্টপূর্বে, চাঁদের আলোকে সূর্যের প্রতিফলিত আলো হিসেবে অনুমান করেছিলেন এবং বিভিন্ন দার্শনিক ও গণিতগত ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন।
তবে তাদের এই ধারণা সীমিত শ্রেণির মানুষদের কাছে পরিচিত ছিল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ছিল না পরবর্তীতে গ্যালিলিও গ্যালিলেই ষোড়শ শতকে টেলিস্কোপ ব্যবহার করে চাঁদের পৃষ্ঠের পাহাড় ও ছায়া পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত করেন যে চাঁদ নিজে আলোক উৎপন্ন করে না, বরং সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। কুরআন সপ্তম শতকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই সত্যটি স্পষ্ট ভাষায় ও অর্থে ঘোষণা করেছে।
অর্থাৎ গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণের প্রায় ৯০০ বছর আগে এই সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে সূর্য নিজে আলোকিত এবং চাঁদ শুধুমাত্র প্রতিফলিত আলো প্রদানকারী হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সূক্ষ্মভাবে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে করেছেন আলোকিত ” সূরা ইউনুস, আয়াত ৫
কুরআনে সূর্যের জন্য ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘শামস’, ‘সিরাজ’ বা ‘ওয়াহহাজ’, যার অর্থ যথাক্রমে মশাল, প্রজ্জ্বলিত বাতি বা উজ্জ্বল জ্যোতি। চাঁদের জন্য ব্যবহৃত ‘কামার’ বা ‘মুনীর’ শব্দটি প্রতিফলিত আলো বোঝায়। অর্থাৎ, কুরআন সূর্যের নিজস্ব আলো এবং চাঁদের প্রতিফলিত আলোর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেছে যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
“তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি বানিয়েছেন সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময়, আর চন্দ্রকে স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারীরূপে।” সূরা ইউনূস, আয়াত ৫
“তোমরা কি লক্ষ্য করো না যে, আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে, এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে।” সূরা নূহ, আয়াত ১৫–১৬
এই আয়াতগুলোও সূর্য ও চাঁদের আলোর প্রকৃতির পার্থক্য নির্দেশ করে। আজ আমরা জানি, চাঁদ নিজে আলোক উৎপন্ন করে না; এটি কেবল সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। কুরআন প্রায় ১৪০০ বছর আগে এ সত্যকে ভাষাগতভাবে নির্ধারণ করেছে। সূর্যকে ‘দীপ্যমান’ ও চাঁদকে ‘আলোকিত’ হিসেবে উল্লেখ করে কুরআন প্রমাণ করেছে যে আলোকের প্রকৃতিতে পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন সভ্যতার ভুল ধারণার বিপরীতে, কুরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞান একত্রে সূর্য ও চাঁদের আলোর প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক সত্য প্রদর্শন করে।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, অর্থ মন্ত্রণালয়
ইএইচ