নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ১, ২০২২, ১২:২২ এএম
তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাঠানো হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের সাইবার মনিটরিং টিম অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থপাচারের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে সাইবার নজরদারি বৃদ্ধি করে।
পরে ওই চক্রের মূলহোতা উল্কা গেমস লিমিটেডের সিইও জামিলুর রশিদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গত সোমবার রাতে রাজধানীর উত্তরা ও মহাখালী এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— উল্কা গেমস লিমিটেডের সিইও জামিলুর রশিদ, তার সহযোগী সায়মন হোসেন, মো. রিদোয়ান আহমেদ, মো. রাকিবুল আলম, মো. মুনতাকিম আহমেদ ও কায়েস উদ্দিন আহম্মেদ।
এসময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, সিপিইউ, সার্ভার স্টেশন, হার্ড ডিস্ক, স্ক্যানার, ডিভিডি ড্রাইভ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ডেভিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও নগদ টাকাসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল টাকা বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, উল্কা গেমস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও গ্রেপ্তারকৃত জামিলুর রশিদ।
২০১৭ সালে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি প্রতিষ্ঠান মুনফ্রগ ল্যাবের সাথে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সে মুনফ্রগ ল্যাবের বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেড় লাখ টাকা বেতনে নিযুক্ত হয়। মুনফ্রগ ল্যাবের অনলাইন জুয়া অ্যাপ ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
তবে গেমটিকে আরো ছড়িয়ে দিতে দেশে বৈধতা দেয়ার জন্য কতিপয় আইনজীবীর পরামর্শে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে জামিরুল রশিদ ‘উল্কা গেমস প্রা. লি.’ নামে একটি গেমিং ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়। ২০১৯ সালে মুনফ্রগের শূন্য দশমিক এক শতাংশ উল্কা গেমসকে দেয়ার মাধ্যমে দেশে গেমিং খাতে উন্নয়নের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়।
তিনি বলেন, দেশে গেম ডেভেলপমেন্টের অনুমোদন থাকলেও অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনোর অনুমোদন না থাকায় উল্কা গেমস বিভিন্ন ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আইনি বৈধতা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে।
এভাবেই ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ যাত্রা শুরু করে শহর নগরে ছড়িয়ে পরে। উল্কা গেমসের যাত্রা গেমিং ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশে শুরু হলেও তারা বস্তুত গেম ডেভেলপমেন্ট না করে তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে পাঠানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
র্যাবের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ মূলত একটি অ্যাপ যা মোবাইলে ডাউনলোড করে খেলা যায়। এই অ্যাপের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ মুনফ্রগ ল্যাবের কাছে রয়েছে। ওই অ্যাপে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ ছাড়াও রাখি, আন্দর বাহার ও পোকার নামেও অনলাইন জুয়ার গেমস রয়েছে। যেকোনো কাজের পাশাপাশি এই গেম খেলতে পারা যাওয়ায় তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয়তা পায়। গেমসের রেজিস্ট্রেশনের পর একজন গ্রাহককে গেমস খেলার জন্য কিছু চিপস ফ্রি দেয়া হয়।
পরবর্তীতে গেমস খেলার জন্য অর্থের বিনিময়ে চিপস ক্রয় করতে হয়। মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে চিপস ক্রয়ের অর্থের লেনদেন হয়।
তিনি আরো জানান, প্রতিদিন প্রায় ৫০ হজার কোটি চিপস বিক্রি হয় এবং প্রতি কোটি চিপস বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৬-৬৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন বট প্লেয়ার বা রোবট প্লেয়ারের মাধ্যমে মূল গেমারদের কৌশলে হারিয়ে প্লেয়ারদের পরবর্তীতে আরো চিপস কিনতে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’-এর চিপস বিক্রয়ের কাজটি ১৪টি অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর/এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এ ডিস্ট্রিবিউটরদের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে বলে জানা যায়।
এ ছাড়াও, প্রাইভেট টেবিল অপশনের মাধ্যমে অন্য প্লেয়ার থেকেও চিপস ক্রয় করা যায়। বর্তমানে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’-এ প্রায় ৯ লাখ নিয়মিত গেমার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার চিপস বিক্রি হয় বলে জানা যায়।
খন্দকার আল মঈন আরো জানান, ভার্চুয়াল চিপস অর্থের বিনিময়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। মূলত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চিপস বিক্রয়ের টাকা ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে উল্কা গেমসের চারটি অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটির অধিক টাকা রয়েছে বলে জানা যায়।
এছাড়াও গত দুই বছর তারা মুনফ্রগ ল্যাবকে ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ কোটি টাকা দিয়েছে। উল্কা গেমসের মোট ৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। বেতন দেয়াসহ অফিস পরিচালনায় প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হতো।
এছাড়াও, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাৎসরিক বেতনের ৩০-৯০ শতাংশ হারে বোনাস দেয়া হতো। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশের বাইরে অনলাইন জুয়ার অর্থ পাঠাত বলেও জানান তিনি।